সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের স্বাস্থ্যসেবা ডিজিটালাইজেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথম পর্যায়ে খুলনা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নরসিংদী ও নোয়াখালী জেলায় এ পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ খাতে ১৬২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ই-হেলথ কার্ড একজন নাগরিকের ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র হিসেবে কাজ করবে। এতে চিকিৎসা ইতিহাস, রোগ নির্ণয়ের তথ্য, প্রেসক্রিপশন, টিকাদান সংক্রান্ত তথ্য, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকবে। জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন নম্বরের সঙ্গে সংযুক্ত এই কার্ডের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দ্রুত এবং সমন্বিত সেবা প্রদান সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, পাইলট প্রকল্পের আওতায় কার্ডধারীরা সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকে অগ্রাধিকারভিত্তিক চিকিৎসাসেবা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মাতৃ ও শিশুসেবা, টিকাদান কর্মসূচি, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড ব্যবহারের সুবিধা পাবেন। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবিমা ও সরকারি স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে এই কার্ড সংযুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সম্প্রতি বাজেট-সংক্রান্ত এক আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশের সব নাগরিককে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়সহ মোট ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ০১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। ফলে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
নতুন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদারকরণ, সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, জরুরি চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা সম্প্রসারণ, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন কর্মসূচি এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিশেষ বরাদ্দ।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-হেলথ কার্ড কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের জন্য দেশের সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর ডিজিটাল সংযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নাগরিকদের ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে পরিচিত ও অভ্যস্ত করে তোলাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। তাঁর মতে, ই-হেলথ কার্ড প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবিমাভিত্তিক সেবার জন্য একটি কার্যকর ভিত্তি তৈরি হবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু কার্ড বিতরণ করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না; হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, চিকিৎসক ও নার্সের পর্যাপ্ত উপস্থিতি, ওষুধ সরবরাহ এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ জেলার পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতা মূল্যায়নের পর সেবার মান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নাগরিক সন্তুষ্টি এবং ব্যয়-সাশ্রয়ের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হবে। ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য জেলায় কর্মসূচিটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয় ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
