রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার আলোচিত মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। ঘটনার মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে রায় দেওয়ায় মামলাটি দেশের বিচারিক ইতিহাসে দ্রুত নিষ্পত্তির একটি উল্লেখযোগ্য নজির হয়ে উঠেছে।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সকালেই দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত সদস্য ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা আদালত প্রাঙ্গণে দায়িত্ব পালন করেন।
যে ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ
গত ১৯ মে পল্লবীর নিজ বাসার পাশের একটি ফ্ল্যাটে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা। ঘটনার নৃশংসতা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়।
তদন্তে উঠে আসে, শিশুটিকে কৌশলে বাসায় ডেকে নেওয়ার পর ধর্ষণ এবং পরে গলা কেটে হত্যা করা হয়। ঘটনার পরপরই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই সময় আটক করা হয় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে।
শক্তিশালী সাক্ষ্য-প্রমাণে অভিযোগ প্রমাণ
মামলার তদন্তে ডিএনএ প্রতিবেদন, ফরেনসিক আলামত, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, এসব তথ্য-প্রমাণ আসামিদের অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করেছে।
দ্রুত তদন্ত শেষে ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ১ জুন অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। পরদিন ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন শিশুটির বাবা-মা, পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, তদন্ত কর্মকর্তা ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ন্যায়বিচারের প্রতিফলন
যুক্তিতর্কে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে জানায়, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বৈজ্ঞানিক আলামতের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে।
বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, মামলায় একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরবচ্ছিন্ন ‘চেইন অব ফ্যাক্ট’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা আসামিদের অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করে।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োজিত আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রধান আসামি সোহেল রানার জন্য যাবজ্জীবন এবং স্বপ্না আক্তারের ক্ষেত্রে লঘুদণ্ডের আবেদন করেছিলেন।
১৭ দিনেই বিচার সম্পন্ন
মামলার তদন্ত, অভিযোগপত্র, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক—সব ধাপ শেষ করে মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে রায় ঘোষণা করা হলো। বিচার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আলোচিত এই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি শিশু নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে।
রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে রামিসার পরিবার দীর্ঘ প্রতীক্ষার একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি দেখলেও, সমাজে শিশু নিরাপত্তা ও নারী-শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ও আলোচনা সামনে এসেছে।