মোটরসাইকেল এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর (Advance Income Tax-AIT) আরোপের প্রস্তাব থেকে সরকার সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্র জানিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ব্যক্তিগত ব্যবহারের মোটরসাইকেল এবং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মালিকদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা পড়বে না।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর আর্থিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে পুনর্বিবেচনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত কর নিয়ে বিতর্ক

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে অগ্রিম আয়করের আওতায় আনার একটি প্রস্তাব বিবেচনায় ছিল বলে জানা যায়।

প্রস্তাব অনুযায়ী, মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ক্ষমতা (সিসি) অনুযায়ী বছরে নির্দিষ্ট পরিমাণ অগ্রিম আয়কর এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে অবস্থানভেদে কর আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

তবে প্রস্তাবটি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী, রাইড-শেয়ার চালক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন পরিবহন-সংশ্লিষ্ট সংগঠনের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। বিভিন্ন স্থানে স্মারকলিপি প্রদান, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়।

ব্যবহারকারীদের উদ্বেগ

মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের মতে, দেশে মোটরসাইকেল এখন শুধু ব্যক্তিগত বাহন নয়; বরং কর্মসংস্থান, শিক্ষা, ব্যবসা ও দৈনন্দিন যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

তাদের যুক্তি, মোটরসাইকেল মালিকরা ইতোমধ্যে নিবন্ধন ফি, রোড ট্যাক্স, ফিটনেস ফি, বীমা এবং জ্বালানির ওপর বিদ্যমান কর পরিশোধ করছেন। এর সঙ্গে নতুন অগ্রিম আয়কর যুক্ত হলে তা সাধারণ ব্যবহারকারীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।

সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আয়

এনবিআর সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, প্রস্তাবিত কর কার্যকর হলে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা খাত থেকে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা ছিল।

তবে নীতিনির্ধারকরা অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক প্রভাব এবং জনস্বার্থ বিবেচনায় বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করেছেন বলে জানা গেছে।

টিআইএন বাধ্যতামূলক হতে পারে উচ্চক্ষমতার মোটরসাইকেলে

সরকারি সূত্র বলছে, অগ্রিম আয়কর বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও ১৫০ সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের মালিকদের জন্য করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) গ্রহণের বাধ্যবাধকতা বজায় থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনা বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশের অপেক্ষা রয়েছে।

বর্তমানে কোন যানবাহনে অগ্রিম আয়কর রয়েছে?

বর্তমানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি, জিপ, বাস, ট্রাক, লরি, ট্যাংকলরি এবং পিকআপসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত যানবাহনের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর আদায় করা হয়।

ফিটনেস নবায়ন বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সময় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এ কর সংগ্রহ করে থাকে।

মোটরসাইকেল খাতের গুরুত্ব

বিআরটিএর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৪৮ লাখ ৭০ হাজার। গত এক দশকে মোটরসাইকেল শিল্পে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ড স্থানীয়ভাবে সংযোজন ও উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন কর আরোপ করা হলে মোটরসাইকেলের বিক্রি, উৎপাদন এবং খাতে নতুন বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারত। একইসঙ্গে রাইড-শেয়ারিং ও ক্ষুদ্র পরিবহনসেবার ব্যয়ও বাড়তে পারত।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাও করমুক্ত থাকছে

একইসঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর প্রস্তাবিত বার্ষিক কর আরোপের পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এর আগে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়নভিত্তিক পৃথক করহার নির্ধারণের প্রস্তাব বিবেচনায় ছিল। তবে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।

যেহেতু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অধিকাংশের কোনো কেন্দ্রীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা নেই, তাই এ খাতের সঠিক পরিসংখ্যান নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা খাত নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থান জনস্বার্থ ও রাজস্ব আহরণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।

তবে কর-সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগে অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা বাজেট নথি প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত কর-সংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্র ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আলোচনার ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। চূড়ান্ত আইনগত অবস্থান নির্ধারিত হবে সরকারের আনুষ্ঠানিক গেজেট, বাজেট দলিল ও এনবিআরের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে।