নেপাল ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর সাম্প্রতিক এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। সংসদে দেওয়া ভাষণে তিনি দাবি করেন, সীমান্ত ইস্যুতে শুধু নেপালের ভূখণ্ডই নয়, কিছু ক্ষেত্রে নেপালও ভারতের ভূখণ্ড দখল করে থাকতে পারে। তাঁর এই মন্তব্য নেপালের রাজনৈতিক অঙ্গন এবং নীতিনির্ধারক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের প্রচলিত কূটনৈতিক অবস্থানের তুলনায় এ বক্তব্য কিছুটা ভিন্নধর্মী। এতদিন কাঠমান্ডু সাধারণত ভারতের বিরুদ্ধে নেপালের ভূখণ্ড দখলের অভিযোগই তুলে এসেছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী শাহর মন্তব্যকে অনেকেই সীমান্ত সমস্যার বাস্তবভিত্তিক ও পারস্পরিক পর্যালোচনার আহ্বান হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মন্তব্য বলেও অভিহিত করছেন।

Advertisement

সংসদে কী বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী?

সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেন, সীমান্ত সংক্রান্ত নথি ও তথ্য পর্যালোচনা করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু তথ্য পেয়েছেন, যা অনুযায়ী কেবল ভারত নয়, কিছু ক্ষেত্রে নেপালও ভারতের ভূখণ্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে বলে ধারণা করা যায়।

তবে তিনি নির্দিষ্ট কোনো এলাকা বা ভূখণ্ডের নাম উল্লেখ করেননি। একইসঙ্গে তিনি দুই দেশকে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানান।

শাহ বলেন, সীমান্ত প্রশ্নে আবেগ নয়, বরং ঐতিহাসিক দলিল, মানচিত্র এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

সীমান্ত বিরোধের কেন্দ্র কোথায়?

নেপাল ও ভারতের প্রায় ১,৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের নাগরিকদের জন্য সীমান্ত পারাপারে ভিসার প্রয়োজন হয় না। তবে উত্তরাখণ্ড সংলগ্ন লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি অঞ্চল নিয়ে কয়েক দশক ধরে বিরোধ বিদ্যমান।

নেপালের দাবি, ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি অনুযায়ী কালী নদীর পশ্চিমাঞ্চল তাদের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। দেশটির মতে, কালী নদীর প্রকৃত উৎস লিম্পিয়াধুরা এলাকায় অবস্থিত। সেই হিসাব অনুযায়ী কালাপানি ও লিপুলেখ নেপালের অংশ।

অন্যদিকে ভারতের অবস্থান হলো, সংশ্লিষ্ট সীমান্ত নদীর উৎস লিপুলেখ অঞ্চলে এবং ঐতিহাসিক প্রশাসনিক নথিপত্র অনুযায়ী বিতর্কিত এলাকা ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।

ইতিহাসের জটিলতা

সীমান্ত বিরোধের মূল সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তিতে, যা তৎকালীন ব্রিটিশ শাসক ও নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তিতে সীমান্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে নদীর নাম উল্লেখ থাকলেও তার সুনির্দিষ্ট উৎসস্থান নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছিল না। একইসঙ্গে চুক্তির সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক মানচিত্রও সংযুক্ত করা হয়নি।

ফলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথি, জরিপ মানচিত্র ও প্রশাসনিক রেকর্ডের ভিন্ন ব্যাখ্যা থেকে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন

কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত বিরোধের টেকসই সমাধানের জন্য ঐতিহাসিক মানচিত্র, ব্রিটিশ আমলের জরিপ রেকর্ড এবং আধুনিক ভূ-তাত্ত্বিক তথ্য একসঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

নেপালের কয়েকজন গবেষক মনে করেন, পুরোনো ব্রিটিশ জরিপ মানচিত্রগুলো পুনরায় বিশ্লেষণ করলে বিরোধপূর্ণ এলাকার ইতিহাস আরও স্পষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে ভারতীয় বিশ্লেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও ঐতিহাসিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তিতে ভারতের অবস্থানকে সমর্থন করে আসছেন।

আঞ্চলিক কূটনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী শাহর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কূটনৈতিক সংকট সৃষ্টি না করলেও সীমান্ত ইস্যুকে নতুনভাবে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় উভয় পক্ষই সাধারণত আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির পক্ষে অবস্থান নেয়।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সীমান্ত প্রশ্নে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে যৌথ জরিপ, তথ্য যাচাই এবং কূটনৈতিক সংলাপই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।

বর্তমান বাস্তবতা

লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি অঞ্চল নিয়ে ভারত ও নেপালের অবস্থান এখনো ভিন্ন। উভয় দেশই নিজ নিজ দাবির পক্ষে ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক নথি উপস্থাপন করে আসছে। ফলে বিষয়টি এখনো দ্বিপক্ষীয় আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক মন্তব্য সীমান্ত বিরোধের সমাধানের পথ সহজ করবে নাকি নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সংলাপ ও রাজনৈতিক উদ্যোগের ওপর।