বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া এবং জলবায়ু ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই সম্ভাব্য নতুন এল নিনো পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্কতা জারি করেছে জাতিসংঘের আবহাওয়া সংস্থা। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রাগত পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর প্রভাব শক্তিশালী হলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টি এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

জাতিসংঘের আওতাধীন **বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO)** জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী মাসগুলোতে এল নিনো পরিস্থিতি শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

Advertisement

কী এই এল নিনো?

এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। সাধারণত কয়েক বছর পরপর এটি দেখা দেয় এবং বিশ্বের আবহাওয়ার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্রের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উষ্ণ হয়ে উঠলে বায়ুমণ্ডলের প্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরণ বদলে যায়। এর ফলে কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে।

কেন উদ্বিগ্ন বিজ্ঞানীরা?

বিশ্ব ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রেকর্ডসংখ্যক উষ্ণ বছর প্রত্যক্ষ করছে। এর সঙ্গে যদি শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হয়, তাহলে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আবহাওয়াবিদদের মতে, শক্তিশালী এল নিনো সাধারণত—

* তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ায়;
* বনভূমিতে দাবানলের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে;
* কৃষি উৎপাদনে প্রভাব ফেলে;
* পানির সংকট ও খরার ঝুঁকি বাড়ায়;
* কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণ হতে পারে।

‘সুপার এল নিনো’ নিয়ে আলোচনা

বিশ্বের কয়েকটি আবহাওয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, বর্তমান পরিস্থিতি শক্তিশালী এল নিনোর দিকে অগ্রসর হতে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞ একে সম্ভাব্য “সুপার এল নিনো” হিসেবে আখ্যায়িত করার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করলেও, বিজ্ঞানীরা বলছেন এ ধরনের মূল্যায়নের জন্য আরও পর্যবেক্ষণ ও তথ্য প্রয়োজন।

যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তরের বিজ্ঞানী **প্রফেসর অ্যাডাম স্কাইফ** বলেন, বর্তমান তথ্য-উপাত্ত শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এর প্রকৃত তীব্রতা ও বৈশ্বিক প্রভাব নির্ভর করবে আগামী কয়েক মাসের আবহাওয়াগত পরিবর্তনের ওপর।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার জন্য কী বার্তা?

জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় তাপপ্রবাহের তীব্রতা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরণে পরিবর্তন এবং কৃষি উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা বৃদ্ধি, পানি ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়েও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হতে পারে।

তবে আবহাওয়াবিদরা জোর দিয়ে বলছেন, এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আন্তর্জাতিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোর হালনাগাদ তথ্য নিয়মিত অনুসরণ করা জরুরি।

বৈশ্বিক প্রস্তুতির আহ্বান

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, সম্ভাব্য চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা এবং জনসাধারণকে আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। সময়মতো সতর্কতা, পানি ও খাদ্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীল পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।