পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ যখন দেশের অধিকাংশ পরিবারে উৎসবের আবহ তৈরি করেছে, তখন রাজধানীর শিশু হাসপাতালের অনেক পরিবারের কাছে ঈদ পরিণত হয়েছে উৎকণ্ঠা, নির্ঘুম রাত আর হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষার আরেক নাম হয়ে।
ঈদের সরকারি ছুটির শেষ দিনে রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে ওয়ার্ডের করিডোর পর্যন্ত রোগী ও স্বজনদের ভিড়। গাছের নিচে মাদুর পেতে কেউ বিশ্রাম নিচ্ছেন, কেউ রাত কাটাচ্ছেন খোলা আকাশের নিচে। অনেকের মুখে ক্লান্তি, চোখে অনিশ্চয়তার ছাপ।

রাজধানীর শিশু হাসপাতাল
ঢাকার আদাবর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম তাদেরই একজন। ঈদ উপলক্ষে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন তিনি। বাসের টিকিটও কাটা ছিল। কিন্তু ছোট মেয়ের অসুস্থতা তাদের পরিকল্পনা বদলে দেয়।
আব্দুল করিম জানান, প্রথমে জ্বর, বমি ও পাতলা পায়খানার উপসর্গ দেখা দিলে মেয়েকে হাসপাতালে আনা হয়। পরে চিকিৎসকেরা হামের সম্ভাবনার কথা জানিয়ে ভর্তি রাখার পরামর্শ দেন।
হাসপাতালের বাইরে বসে তিনি বলেন, “ঈদের সব পরিকল্পনা বাতিল হয়ে গেছে। মেয়ের চিকিৎসাই এখন সবচেয়ে বড় বিষয়। কয়েকদিন ধরে হাসপাতালেই আছি। কখনো করিডোরে, কখনো বাইরে বসে সময় কাটছে। ঈদের জন্য পাওয়া বেতন ও বোনাসের বড় অংশ চিকিৎসা ও আনুষঙ্গিক খরচে চলে গেছে।”
তাঁর মতো আরও অনেক পরিবার ঈদের আনন্দের পরিবর্তে হাসপাতালের পরিবেশে কাটাচ্ছেন সময়। কেউ সন্তানের জ্বর নিয়ে উদ্বিগ্ন, কেউ জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য অপেক্ষমাণ।
হাসপাতালের এক কোণে দেখা যায় আরেক মাকে। তাঁর কিশোরী কন্যা দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ। চিকিৎসার ধারাবাহিকতায় নতুন করে ভর্তি করানোর জন্য তাঁরা হাসপাতালে এসেছেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রোগ শনাক্ত হওয়ার পর থেকে নিয়মিত চিকিৎসা চলছে, আর সেই লড়াইয়ের মধ্যেই কেটে যাচ্ছে উৎসবের সময়।
হাসপাতালের ওপর বাড়তি চাপ
শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হাম আক্রান্ত ও উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে ঈদের ছুটির মধ্যেও চিকিৎসাসেবা সচল রাখতে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আজহারুল ইসলাম জানান, ছুটির দিনেও সিনিয়র চিকিৎসকরা নিয়মিত রোগী পরিদর্শন করেছেন এবং প্রশাসনিক পর্যায় থেকে সার্বক্ষণিক তদারকি চলছে।
তিনি বলেন, “বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাম আক্রান্ত শিশুদের এখানে পাঠানো হচ্ছে। রোগীর চাপ অনেক বেশি হলেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখতে। বিছানা খালি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন রোগী ভর্তি নিতে হচ্ছে।”
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ১১৮ জন শিশু হাম আক্রান্ত অথবা হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯৪১ জন হাম আক্রান্ত শিশু এখানে ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
উদ্বেগজনক জাতীয় চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হামে ৯০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হাম ও সংশ্লিষ্ট উপসর্গে আরও ৪৯৩ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
একই সময়কালে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৯৯৬ জনে। এছাড়া সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ৬৯ হাজার ৬১২।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫৫ হাজার ৭০৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ৫২ হাজার ৫০ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এরপর রয়েছে বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ এবং শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত জটিলতা তৈরি করতে পারে। সময়মতো টিকাদান, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
তাদের মতে, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ কমাতে মাঠপর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
উৎসবের আড়ালে আরেক বাস্তবতা
ঈদের দিনগুলো সাধারণত পরিবার, আনন্দ এবং মিলনের প্রতীক। কিন্তু শিশু হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়ালে অন্য এক বাস্তবতা চোখে পড়ে—যেখানে ঈদের নতুন পোশাকের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে একটি শিশুর জ্বর কমা, একটি পরীক্ষার রিপোর্ট কিংবা চিকিৎসকের আশ্বস্ত করা কয়েকটি বাক্য।
অনেক পরিবারের জন্য এবারের ঈদ তাই উৎসবের নয়, বরং প্রার্থনার। তাদের একটাই প্রত্যাশা—সন্তান সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরুক, তাহলেই আবার ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া ঈদের আনন্দ।
