পাহাড়ের বুকজুড়ে সাদা মাটির (চীনামাটি) বিস্তার, সোমেশ্বরী নদীর স্বচ্ছ জলধারা, বিস্তীর্ণ বালুচর আর সীমান্তঘেঁষা সবুজ পাহাড়—প্রকৃতির এমন অপরূপ সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলা। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন অসংখ্য পর্যটক। তবে নদী পারাপারের দুর্ভোগ দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা।

এ দুর্ভোগ লাঘবে সোমেশ্বরী নদীর তেরীবাজার ও শিবগঞ্জ ঘাটে তৃতীয়বারের মতো নির্মিত হচ্ছে অস্থায়ী কাঠের সেতু। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের উদ্যোগ ও সহায়তায় সেতুগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সোমেশ্বরী নদীর ওপর স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রকল্প একনেকের সভায় অনুমোদন পেয়েছে। শিগগিরই দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি ও দরপত্র আহ্বানের সময়সূচি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

কাঠের সেতু নির্মাণকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাঁদের আশা, সেতু চালু হলে নদীর দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াত সহজ হবে, দৈনন্দিন দুর্ভোগ কমবে এবং দুর্গাপুরের পর্যটন সম্ভাবনা আরও বিকশিত হবে।

নির্মাণাধীন কাঠের সেতু দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল করতে না পারলেও মিনিট্রাক, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির মতো যানবাহন চলাচলের সুযোগ থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অস্থায়ী সেতুর পাশাপাশি স্থায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসতে পারে।

নদী পারাপারে ভোগান্তিতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ

তেরীবাজার ও শিবগঞ্জ ঘাট দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, কর্মজীবী মানুষ, কৃষক ও সাধারণ যাত্রীদের চলাচল করতে হয়। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা প্রয়োজনে তাঁদের নদী পার হতে হয়। কিন্তু নদীর স্রোত, পানির উচ্চতা ও ঋতুভেদে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে প্রায়ই ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রীদের। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় নদী পারাপার আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

এ দুর্ভোগ লাঘবে তেরীবাজার, শিবগঞ্জ ও বিরিশিরি-সংলগ্ন শিবগঞ্জ ঘাটে কাঠের সেতু নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে নদীর দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াতে সাময়িক স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থানীয় পরিবহন, আবাসন, খাবারের দোকান ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে দুর্গাপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকদের যাতায়াতও সহজ হবে।

সেতু চালু হলে উপকৃত হবে শিক্ষার্থীরা

এসএসসি পরীক্ষার্থী ফাহিম বলেন, সামনে তাঁদের টেস্ট পরীক্ষা শুরু হবে। শীতের সকালে প্রাইভেট পড়তে শিবগঞ্জ থেকে দুর্গাপুর যেতে হয়। কাঠের সেতু চালু হলে নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। দ্রুত নদী পার হয়ে আবার দ্রুত বাড়িতে ফিরতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

এ উদ্যোগের জন্য ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে ধন্যবাদ জানান ফাহিম।

৭৫০ ফুট দীর্ঘ কাঠের সেতু নির্মাণের কাজ চলছে

কাঠের সেতু নির্মাণকাজের সমন্বয়কারী শাহ আলম বলেন, সোমেশ্বরী নদীর ওপর নির্মাণাধীন ৭৫০ ফুট দীর্ঘ কাঠের সেতুটি শুধু নদী পারাপারের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ-চাহিদা, পর্যটন বিকাশের প্রত্যাশা এবং দুর্গাপুরের উন্নয়ন সম্ভাবনার সঙ্গে জড়িত একটি উদ্যোগ।

তিনি বলেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য তাঁরা জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের প্রতি কৃতজ্ঞ। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই সেতুটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। গত তিন বছর ধরে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, পর্যটক ও স্থানীয় শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ লাঘবে এ ধরনের অস্থায়ী কাঠের সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে।

শাহ আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপারে সামান্য অর্থ নেওয়া হয়। সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থ প্রতিবছর স্থানীয় বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের সংস্কারকাজে ব্যয় করা হয়।

স্থায়ী সেতুর অপেক্ষায় এলাকাবাসী

কাঠের সেতু নির্মিত হলে নদীর দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে যোগাযোগ ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধানের জন্য পাকা সেতু নির্মাণ জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, চলমান কাঠের সেতুর নির্মাণকাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হবে এবং স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রকল্পগুলোর দরপত্র ও পরবর্তী কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে যাবে। দীর্ঘদিনের যোগাযোগ-দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে সোমেশ্বরী নদীর ওপর স্থায়ী সেতু নির্মিত হবে—এমন প্রত্যাশা নদীর দুই পাড়ের মানুষের।