“উত্থাল সাগরে এত বড় ঢেউয়ের সামনে দাঁড়াও কীভাবে?”
প্রশ্ন শুনে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের দিকে তাকিয়ে ফাতেমা আক্তারের সহজ উত্তর—সমুদ্রকে ভয় পেলে সার্ফার হওয়া যায় না। ঢেউ তাকে ভয় দেখায় না; বরং ঢেউই তাকে শেখায় কীভাবে লড়তে হয়।
এই একটি বাক্যেই যেন লুকিয়ে আছে কক্সবাজারের দশম শ্রেণির এই কিশোরীর দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। নেই জাঁকজমকপূর্ণ ক্রীড়া সরঞ্জাম, নেই আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের নিশ্চয়তা। আছে সীমিত সামর্থ্য, পুরোনো সার্ফবোর্ড, কঠোর অনুশীলন আর স্বপ্ন আঁকড়ে থাকার এক দুর্দমনীয় মানসিকতা।
ফাতেমা এখন আর শুধু কক্সবাজারের সৈকতের পরিচিত মুখ নন। তিনি বাংলাদেশের সার্ফিং ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায়ের প্রতীক। ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমসে প্রথমবার সার্ফিং অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সেই ঐতিহাসিক আসরে বাংলাদেশের নারী বিভাগে প্রতিনিধিত্ব করবেন ফাতেমা আক্তার। তাঁর সঙ্গে পুরুষ বিভাগে থাকছেন মোহাম্মদ মান্নান।
এশিয়ান গেমসের মূল আসর শুরু হবে ১৯ সেপ্টেম্বর। তবে সার্ফিং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে ২৫ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর, জাপানের আইচি প্রিফেকচারের তাহারা শহরের প্যাসিফিক লং বিচে। ২৫ সেপ্টেম্বর নারীদের প্রথম ও দ্বিতীয় রাউন্ড দিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে; ২৮ সেপ্টেম্বর নারী ও পুরুষ উভয় বিভাগে সেমিফাইনাল, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ও ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে।
ফাতেমার সামনে তাই অপেক্ষা করছে এক নতুন সমুদ্র, শক্তিশালী প্রতিপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চের কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু তাঁর কাছে এই যাত্রা শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ঘটনা নয়। এটি নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার, বাংলাদেশের পতাকাকে নতুন এক ক্রীড়াঙ্গনে তুলে ধরার এবং দেশের মেয়েদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খোলার লড়াই।
শূন্য থেকে উত্থান
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে সকালে ফাতেমাকে দেখলে মনে হয়, সমুদ্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটি যেন বহু পুরোনো। ঢেউয়ের গতি লক্ষ্য করছেন, অপেক্ষা করছেন উপযুক্ত মুহূর্তের জন্য। তারপর সার্ফবোর্ডে উঠে ছুটে চলেছেন ঢেউয়ের সঙ্গে।
অথচ কয়েক বছর আগেও সার্ফিং কী—সেটিই জানতেন না ফাতেমা।

সৈকতে অন্যদের সার্ফিং করতে দেখে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। প্রথম দিন পানিতে নামার সময় ভয়ও পেয়েছিলেন। হাতে বোর্ড, সামনে বিশাল সমুদ্র—সবই ছিল নতুন। প্রথমে বোর্ডের ওপর শুয়ে ঢেউ নেওয়া, তারপর ধীরে ধীরে দাঁড়ানোর চেষ্টা।
একসময় দাঁড়িয়ে গেলেন।
আর সেই মুহূর্তেই যেন বদলে গেল গল্পটা।
ফাতেমার ভাষায়, ঢেউ নেওয়া এবং বোর্ডে দাঁড়ানোর পর সার্ফিং তাঁর কাছে ভালো লাগতে শুরু করে। এরপর প্রায় প্রতিদিনই তিনি সমুদ্রের কাছে ফিরেছেন। ধীরে ধীরে শখ হয়ে ওঠে নেশা, আর নেশা পরিণত হয় স্বপ্নে। তাঁর নিজের কথাতেই, সার্ফিং যেন রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে।
ছয় বছর আগের সেই অচেনা খেলাই আজ তাঁকে নিয়ে এসেছে এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মঞ্চগুলোর একটিতে।
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই
ফাতেমার পথ অবশ্য কেবল সমুদ্রের ঢেউয়ে কঠিন হয়নি। জীবনের বাস্তব ঢেউও তাঁকে কম পরীক্ষা নেয়নি।
মহেশখালীতে পৈতৃক শিকড় হলেও জীবিকার প্রয়োজনে পরিবার চলে আসে কক্সবাজার শহরের কাছে। চার ভাই-বোনের মধ্যে ফাতেমা তৃতীয়। পরিবারের আর্থিক সংকট এবং বাবাকে হারানোর পর সংসারের দায়িত্ব আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
মা মনোয়ারা বেগমকে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে সংগ্রাম করতে হয়েছে। অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন, জীবিকার জন্য নানা ধরনের শ্রম করেছেন। সেই বাস্তবতার মধ্যেই বড় হয়েছে ফাতেমার সার্ফিংয়ের স্বপ্ন।
একদিকে পরিবারের অনটন, অন্যদিকে একটি ব্যয়বহুল ও সরঞ্জামনির্ভর খেলা। সার্ফিংয়ের জন্য প্রয়োজন মানসম্মত বোর্ড, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, শারীরিক প্রস্তুতি, পুষ্টি এবং আন্তর্জাতিক মানের ঢেউয়ে অনুশীলনের সুযোগ। ফাতেমার মতো সীমিত আয়ের পরিবারের একজন ক্রীড়াবিদের জন্য এগুলোর অনেকটাই নাগালের বাইরে।
তবু তিনি থামেননি।
সামাজিক কটাক্ষও ছিল প্রতিপক্ষ
ফাতেমার সংগ্রামের আরেকটি দিক ছিল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। একটি মেয়ে সমুদ্রে নেমে সার্ফিং করছে—শুরুতে বিষয়টি অনেকের কাছেই স্বাভাবিক ছিল না।
ফাতেমার মা মনোয়ারা বেগমের বর্ণনায়, প্রতিবেশীদের নানা মন্তব্য শুনতে হয়েছে। মেয়ের বিয়ে হবে কি না, মেয়েটি কেন সমুদ্রে যায়—এমন প্রশ্নও উঠেছে।
অর্থনৈতিক কষ্টের সঙ্গে সামাজিক চাপও তাই ফাতেমার লড়াইয়ের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু মেয়ের চোখের স্বপ্নটি বুঝতে পেরেছিলেন মা। ফলে বাধা না হয়ে তিনিই হয়ে ওঠেন মেয়ের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
আজ সেই ফাতেমাই দেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে এশিয়ান গেমসের মঞ্চে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একাধিক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তাঁকে বাংলাদেশের প্রথম নারী এশিয়ান গেমস সার্ফার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাফল্যের প্রথম স্বীকৃতি
ফাতেমার এশিয়ান গেমসে পৌঁছে যাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে একদিনে নয়।
২০২৫ সালের এশিয়ান সার্ফিং চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ অংশ নেয়। সেখানে বাংলাদেশের পাঁচ সার্ফারের মধ্যে ছিলেন ফাতেমাও। দলগতভাবে বাংলাদেশের নবম স্থান অর্জন এশিয়ান গেমসের জন্য যোগ্যতা অর্জনের পথ তৈরি করে।
এরপর ২০২৬ সালের জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় নারী বিভাগে ফাতেমার সাফল্য তাঁর জায়গাকে আরও শক্ত করে। এখন তাঁর সামনে দেশের সার্ফিংয়ের প্রথম বড় এশীয় মঞ্চ।
এশিয়ান গেমসে সার্ফিং এবারই প্রথম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ফাতেমার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুধু তাঁর নিজের নয়, বাংলাদেশের সার্ফিংয়েরও একটি নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে।
কোচের চোখে ফাতেমা
ফাতেমার কোচ রাশেদ আলমের কাছে সার্ফিং শুধু শারীরিক শক্তির খেলা নয়। সমুদ্রকে পড়তে হয়, ঢেউয়ের গতি বুঝতে হয়, স্রোতের দিক ধরতে হয় এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
ফাতেমা ধীরে ধীরে সেই দক্ষতা অর্জন করেছেন।
তবে কোচের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও এগোতে হলে প্রয়োজন উন্নত প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চমানের প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলে ফাতেমার দক্ষতা আরও বাড়তে পারে।
সমস্যাটি এখানেই—প্রতিভার ঘাটতি নয়, সুযোগের ঘাটতি।
সার্ফিংয়ের জন্য পৃষ্ঠপোষকতার সংকট
বাংলাদেশে ক্রিকেট, ফুটবল বা ক্রিকেটারদের নিয়ে যে পরিমাণ বাণিজ্যিক আগ্রহ রয়েছে, সার্ফিং এখনো তার ধারেকাছেও নেই। অথচ কক্সবাজারের সমুদ্র বাংলাদেশের জন্য এই খেলাটির স্বাভাবিক প্রশিক্ষণভূমি হতে পারে।
ক্রীড়া সাংবাদিক মাহবুবুর রহমানের মতে, ফাতেমার মতো ক্রীড়াবিদদের এগিয়ে নিতে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীও আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতিকে এই খেলাটির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশের সার্ফারদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও ভালো করার সুযোগ তৈরি হবে।
কক্সবাজারের ঢেউ থেকে জাপানের সমুদ্র
ফাতেমার সামনে এখন আর শুধু কক্সবাজারের ঢেউ নয়।
জাপানের আইচি প্রিফেকচারের তাহারা শহরে প্যাসিফিক লং বিচে ২৫ সেপ্টেম্বর শুরু হবে এশিয়ান গেমসের সার্ফিং। অফিসিয়াল সূচি অনুযায়ী ২৫ সেপ্টেম্বর নারী সার্ফারদের প্রথম ও দ্বিতীয় রাউন্ড, ২৬ সেপ্টেম্বর তৃতীয় রাউন্ড, ২৭ সেপ্টেম্বর কোয়ার্টার ফাইনাল এবং ২৮ সেপ্টেম্বর সেমিফাইনাল, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ও ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে।
সেখানে ফাতেমার প্রতিপক্ষ হবেন এশিয়ার অভিজ্ঞ সার্ফাররা। বাংলাদেশের জন্যও এটি হবে নতুন অভিজ্ঞতা। পদক আসবে কি না, সেটি এখনই বলা যায় না। কিন্তু ইতিহাসের একটি অংশ ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে—বাংলাদেশ প্রথমবার এশিয়ান গেমসের সার্ফিংয়ে অংশ নিচ্ছে, আর নারী বিভাগে সেই দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন কক্সবাজারের ফাতেমা আক্তার।
এটি শুধু সার্ফিংয়ের গল্প নয়
ফাতেমার গল্প তাই কেবল ঢেউয়ের ওপর ভারসাম্য রাখার গল্প নয়।
এটি দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প। সামাজিক কটাক্ষ অতিক্রম করার গল্প। মায়ের ত্যাগকে শক্তিতে পরিণত করার গল্প। সুযোগ সীমিত হলেও স্বপ্নকে সীমিত না করার গল্প।
একদিন যে মেয়েটি জানতেনই না সার্ফিং কী, আজ সেই মেয়েটিই বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে জাপানের সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছেন।
হয়তো তাঁর হাতে থাকবে একটি সার্ফবোর্ড। সামনে থাকবে বিশাল প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউ। প্রতিপক্ষ হবে অভিজ্ঞ সার্ফাররা।
কিন্তু ফাতেমা ইতিমধ্যেই জানেন—ঢেউকে থামানো যায় না।
ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করেই সামনে এগোতে হয়।
আর সেই লড়াইয়ের মধ্যেই হয়তো লেখা হবে বাংলাদেশের সার্ফিংয়ের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক গল্প।