প্রায় চার দশক পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পথ খুলেছে, এমন এক সময় যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া এই সংলাপকে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
শনিবার সকালে পাকিস্তানের নূর খান বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এই সংলাপকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
মার্কিন প্রতিনিধি দলে রয়েছেন জ্যারেড কুশনার এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফসহ বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ; সঙ্গে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম দুই দেশের মধ্যে এমন সরাসরি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ স্থাপিত হতে যাচ্ছে—যা দীর্ঘদিনের বৈরিতার প্রেক্ষাপটে এক বিরল ঘটনা। তবে আলোচনার শুরুতেই নানা শর্ত ও অবিশ্বাস প্রক্রিয়াটিকে জটিল করে তুলেছে।

ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ না হলে তারা আলোচনায় অগ্রসর হবে না। একই সঙ্গে তেহরান বিদেশে জব্দ করা প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ফেরত দেওয়ার দাবিও তুলেছে। ইরানি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই শর্তগুলো তাদের জন্য ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচিত।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরলেও সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে। ওয়াশিংটন ছাড়ার আগে ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আন্তরিকভাবে আলোচনায় অংশ নিতে প্রস্তুত, তবে সময়ক্ষেপণ বা কৌশলী আচরণ মেনে নেওয়া হবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও কঠোর সুরে সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনায় অগ্রগতি না হলে সামরিক বিকল্প আবার সামনে আসতে পারে। একই সঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপেরও সমালোচনা করেছেন।
এই সংলাপে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে শাহবাজ শরিফ-এর নেতৃত্বে পাকিস্তান নিজেকে একটি ‘সহায়ক প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ইসলামাবাদ জানিয়েছে, সংলাপকে ফলপ্রসূ করতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে, যদিও সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো জটিল।
আলোচ্যসূচিতে রয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়। এসব ইস্যুতে দুই পক্ষের অবস্থান এখনও বেশ দূরত্বে অবস্থান করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রাথমিক এই বৈঠক থেকে বড় কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা সীমিত। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার একটি ভিত্তি তৈরি করতে পারে এবং উত্তেজনা প্রশমনে অন্তত আংশিক সমঝোতার পথ খুলে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইসলামাবাদের এই সংলাপ কূটনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হলেও, গভীর অবিশ্বাস ও বহুমাত্রিক স্বার্থের সংঘাতে এর সাফল্য এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
