সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ১নং বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বরাদ্দ দেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নগদ অর্থ ও চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত সরকার ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কৃষকদের কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে আদায় এবং নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম চাল দেওয়ার অভিযোগ এনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যরা বলছেন, সরকারি বরাদ্দের ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে চাল যথাযথভাবে বিতরণ করা হয়েছে। তাদের দাবি, ৩০০ টাকা নেওয়ার বিষয়টি সরকারি নির্ধারিত ইউনিয়ন করের টাকা এবং তা কেউ জোরপূর্বক আদায় করেনি।
অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, বেহেলী ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বরাদ্দ হিসেবে ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়। গত ১৬ ও ১৭ আগস্ট ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে এসব সহায়তা বিতরণের সময় কৃষকদের কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে জোরপূর্বক আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, ৩০০ টাকা না দিলে ১৫ কেজি চাল ও ৩ হাজার টাকা দেওয়া হবে না—এমন চাপ প্রয়োগ করা হয়। ফলে অনেক কৃষক ধার-দেনা করে ওই টাকা পরিশোধ করে সরকারি সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগে নির্ধারিত ১৫ কেজির পরিবর্তে কোনো কোনো কৃষককে প্রায় ১৩ কেজি করে চাল দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। চাল বিতরণের সময় বস্তা ছিঁড়ে চাল পড়ে যাওয়া এবং বিতরণে ওজনের অসঙ্গতির কথাও অভিযোগে উঠে এসেছে। এসব অনিয়মের পক্ষে ছবি ও ভিডিও ফুটেজ রয়েছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ৩০০ টাকা আদায়ের জন্য দেওয়া কিছু রশিদে আদায়কারীর স্বাক্ষর থাকলেও অনেক রশিদে স্বাক্ষর নেই। এমনকি কোন সনের বা কোন খাতের কর আদায় করা হয়েছে, সেটিও কিছু রশিদে উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
চেয়ারম্যানের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত সরকার বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর বরাদ্দকৃত ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে চাল ইউনিয়ন পরিষদের গঠিত কমিটির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মেম্বারদের উপস্থিতিতে ভুক্তভোগী কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।”
৩০০ টাকা আদায়ের অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করে চেয়ারম্যান বলেন, “সরকারি নির্ধারিত কর পরিশোধের জন্য এক থেকে দুই সপ্তাহ আগে থেকেই ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে জানানো হয়েছিল। অধিকাংশ নাগরিক ও কৃষক কার্ডধারী বরাদ্দ পাওয়ার আগেই নিজেদের ইচ্ছায় কর পরিশোধ করে রশিদ নিয়েছেন। কাউকে জোর করে টাকা নেওয়া হয়নি।”
চাল কম দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “দুইজন কৃষককে একটি করে ৩০ কেজির বস্তা দেওয়া হয়েছে, যাতে বিতরণে সময় কম লাগে। বস্তা ছিঁড়ে গেলে বা চাল মিশ্রিত হয়ে গেলে সামান্য কম-বেশি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে কেউ আমার কাছে অভিযোগ করেনি।”
সচিব ও ইউপি সদস্যদের বক্তব্য
বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের দায়িত্বে থাকা প্রদীপ রায় বলেন, “সরকারি করের টাকা আদায়ে কাউকে কোনো ধরনের জবরদস্তি করা হয়নি। সচেতন নাগরিকরা নিজেদের ইচ্ছায় কর পরিশোধ করেছেন। এমনকি বিতরণের দিনও কাউকে জোর করা হয়নি। এখনো অনেক নাগরিক কর পরিশোধ করেননি।”
৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জালাল মেম্বার বলেন, “আমাদের চেয়ারম্যান সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমরা উপস্থিত ছিলাম। এমন কোনো ঘটনা ঘটলে আমরা জানতাম। সবাই ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে চাল পেয়েছেন। করের টাকা সবাই বরাদ্দ নেওয়ার আগেই নিজেদের ইচ্ছায় পরিশোধ করেছেন।”
তিনি আরও দাবি করেন, অভিযোগকারীদের মধ্যে মাইন উদ্দিনের নাম ওই বরাদ্দের তালিকায় নেই। নয়ন ও ওয়াসিম আকরাম যথাযথভাবে টাকা ও চাল বুঝে নিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কাশেম মেম্বার বলেন, “বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়নি। আমি কমিটির একজন সদস্য ছিলাম। কমিটির অন্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। সবার সামনে টাকা ও চাল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। অভিযোগকারী শামীম নিজেও ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি চাল নিয়েছেন।”
৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জিতু মেম্বার বলেন, “এটি একটি ভিত্তিহীন অভিযোগ। চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের সম্মানহানি করার জন্য এসব করা হয়েছে। আমরা সব মেম্বার সেখানে উপস্থিত ছিলাম। সচিব ও চেয়ারম্যান সম্পূর্ণ নির্দোষ। করের টাকা সবাই বরাদ্দ পাওয়ার আগেই পরিশোধ করেছেন।”
কৃষকের বক্তব্য
বেহেলী গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ও বরাদ্দ পাওয়া কৃষক সুখল দাশ বলেন, “আমি একজন বরাদ্দ পাওয়া কৃষক। সেখানে উপস্থিত থেকে ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি চাল পেয়েছি। আমরা শান্তিপূর্ণভাবেই সহায়তা পেয়েছি। কোনো কৃষককে অভিযোগ করতে দেখিনি। প্রত্যেক ওয়ার্ডের মেম্বাররা নিজ নিজ ওয়ার্ডের কৃষকদের দায়িত্ব নিয়ে বরাদ্দ বুঝিয়ে দিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা বরাদ্দ পাওয়ার আগেই নিজেদের কর পরিশোধ করেছি। যারা টাকা পাওয়ার পরও কর দেয়নি, তাদেরও জোর করা হয়নি।”
তদন্তে প্রশাসন
এ বিষয়ে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী রাণী মোদকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “কৃষকদের লিখিত একটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্তের জন্য দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”