বর্ষার পানিতে তিতাস নদী এখন টইটম্বুর। নদীর বুকে শত শত নৌকার আনাগোনা, সঙ্গে ভক্তদের আগমন—সব মিলিয়ে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার খড়মপুর এলাকা। শাহ সৈয়দ আহমদ গেছুদারাজ (রহ.) ওরফে শাহপীর কল্লা শহীদের মাজারকে ঘিরে আগামী সোমবার (১০ আগস্ট) শুরু হচ্ছে সপ্তাহব্যাপী বার্ষিক ওরস।
ওরস চলবে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত। ১৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে আখেরি মোনাজাত। প্রতিবছর এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম ঘটে। ইতোমধ্যে সড়ক, রেল ও নৌপথে ভক্তদের আগমন শুরু হয়েছে।
ওরসকে কেন্দ্র করে মাজার প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় মাসব্যাপী মেলাও বসেছে। ভক্তদের আনাগোনায় ইতোমধ্যে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। বর্ষাকালে তিতাস নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় নৌপথে ভক্তদের যাতায়াতও বাড়ছে।
ওরস উপলক্ষে শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় খড়মপুর মাজার শরীফ কমপ্লেক্সে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে ওরসের বিভিন্ন আয়োজন ও নিরাপত্তা প্রস্তুতির কথা তুলে ধরেন আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া, মাজার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম খাদেম মিন্টু এবং কমিটির সদস্য কাজী শরীফ খাদেম।
মাজার পরিচালনা কমিটি জানিয়েছে, ওরস নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকেও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
ইউএনও তাপসী রাবেয়া বলেন, ওরস উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাজার ও আশপাশের এলাকায় ৩৮টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
রেলপথে দুর্ঘটনা এড়াতেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। মাজারের পাশ দিয়ে ট্রেন চলাচলের সময় অতিরিক্ত হর্ন বাজানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে রেললাইনের আশপাশে থাকা ভক্ত ও দর্শনার্থীরা সতর্ক হতে পারেন।
মাজার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম খাদেম মিন্টু বলেন, ‘১০ আগস্ট থেকে ওরস আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। তবে এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভক্তরা আসতে শুরু করেছেন। ওরস সফল ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’
কমিটির সদস্য কাজী শরীফ খাদেমও জানান, সপ্তাহব্যাপী ওরসকে সামনে রেখে মাজার কমিটির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে।
শাহপীর কল্লা শহীদের মাজারের প্রচলিত ইতিহাস
শাহ সৈয়দ আহমদ গেছুদারাজ (রহ.) ওরফে কল্লা শহীদের মাজারকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে নানা ঐতিহাসিক বর্ণনা ও কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গে সিলেট অভিযানে আসা ৩৬০ আউলিয়ার একজন ছিলেন সৈয়দ আহমদ গেছুদারাজ (রহ.)।
লোককথায় বলা হয়, তৎকালীন রাজা আচক নারায়ণের বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। পরে তাঁর বিচ্ছিন্ন মস্তক তিতাস নদীর স্রোতে ভেসে খড়মপুর এলাকায় আসে। স্থানীয় জেলেদের জালে মস্তকটি আটকা পড়ার পর সেটিকে কেন্দ্র করে নানা অলৌকিক ঘটনার বর্ণনাও প্রচলিত রয়েছে।
স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, পরে খড়মপুর এলাকায় তাঁর মস্তক দাফন করা হয় এবং ধীরে ধীরে স্থানটি পীর কল্লা শহীদের মাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মাজারের ইতিহাস ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিংবদন্তি স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত।
মাজার পরিচালনা সংশ্লিষ্টদের দাবি, মাজার শরীফের বিস্তীর্ণ জমি তৎকালীন আগরতলা রাজ্যের মহারাজার দান করা। তবে এসব ঐতিহাসিক বর্ণনার বিভিন্ন অংশের স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক উৎসভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন।
প্রতিবছর ওরস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্তরা খড়মপুরে আসেন। তাদের নিরাপদ যাতায়াত ও অবস্থান নিশ্চিত করতে এবারও প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাজার পরিচালনা কমিটি সমন্বিতভাবে কাজ করছে।