চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার নিগার সিদ্দিক ডিগ্রি কলেজে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম এবং প্রায় ২০ লাখ টাকার আর্থিক গরমিলের অভিযোগ তদন্তে মাঠে নামছে উপজেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি। আগামী ৩ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টায় কলেজে সরেজমিনে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবে কমিটি। তদন্তের আগে প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র প্রস্তুত রাখা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়ে নোটিশ জারি করা হয়েছে।

বুধবার (২৯ জুলাই) দুপুরে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. মাসুদ হোসেন পলাশ স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে বলা হয়, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নির্দেশে কলেজের অধ্যক্ষ ও গভর্নিং বডির সভাপতির বিরুদ্ধে কলেজ তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ এবং বাংলা বিভাগের শিক্ষক আরলিজা খাতুনের বিধিবহির্ভূত নিয়োগের অভিযোগ তদন্ত করা হবে।

নোটিশে তদন্তের সময় অভিযোগসংশ্লিষ্ট সব মূল নথি, হিসাবপত্র, রেজিস্টার, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ভাউচার, সভার কার্যবিবরণী এবং নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগকারী, অভিযুক্ত ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারী ও গভর্নিং বডির সদস্যদের উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না করলে বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।

এর আগে কলেজের অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটির প্রতিবেদনে ১৯ লাখ ৯৫ হাজার ৬২৫ টাকার আর্থিক গরমিলের অভিযোগ ওঠে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত ২১ মাসে কলেজ তহবিল থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ ব্যয়, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, হিসাব গোপন এবং বিভিন্ন খাতে অনিয়ম করা হয়েছে।

অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়, কলেজের পরীক্ষা ও ভর্তি উপকমিটির সদস্যদের সম্মানী না দিয়েও কাগজে অর্থ পরিশোধ দেখানো হয়েছে। কলেজের গাছ বিক্রির অর্থ মূল ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে অন্যভাবে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় দিবস পালন না করেও ভুয়া বিল দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন, ক্রয় কমিটি ছাড়া কেনাকাটা, দরপত্র ছাড়াই ব্যয়, টিএ-ডিএ বিল উত্তোলন এবং অভিভাবক সমাবেশ না করেও খরচ দেখানোর অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ডিগ্রি শাখার ভর্তি, সেশন ও ফরম পূরণের অর্থ নিয়মিত ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে আলাদা হিসাবের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়েছে। অথচ ওই শাখার ব্যয় বহন করা হয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক শাখার সাধারণ তহবিল থেকে। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আয়-ব্যয়ের চিত্র আড়াল করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

এদিকে কলেজের বাংলা বিভাগে আরলিজা খাতুন নামে এক শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা অনুসরণ না করে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন কলেজের হাজিরা খাতা ও সংশ্লিষ্ট নথিতে তাঁর নাম ছিল না। পরে পুরোনো নিয়োগ দেখিয়ে বেতন চালুর অভিযোগও ওঠে। স্থানীয়ভাবে এ নিয়োগের বিপরীতে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের গুঞ্জন থাকলেও এ বিষয়ে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে কলেজের শিক্ষক পরিষদের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা শিক্ষা অফিস এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কলেজের অধ্যক্ষ আবু নাসির। তিনি বলেন, সব কার্যক্রম নিয়ম মেনেই পরিচালিত হয়েছে। আগামী ৩ তারিখে সব বিষয়ে জানা যাবে। আমার বিরুদ্ধে একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে।

গভর্নিং বডির সভাপতি ইউসুফ হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে তদন্ত কমিটির সরেজমিন অনুসন্ধানকে ঘিরে কলেজজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে এবং প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।