অনলাইন জুয়া পরিচালনার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর তথ্য ও ছবি বিতরণে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ১২, সিপিসি-৩ মেহেরপুরের বিরুদ্ধে। মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে অভিযুক্তের মুখ ঝাপসা (ব্লার) করে ছবি সরবরাহ করা হলেও, একই সময়ে সেই ব্যক্তির স্পষ্ট ছবি স্থানীয় কয়েকটি ফেসবুক পেজ, টিকটক এবং দুই-একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেহেরপুর জেলার মূলধারার গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, ২২ জুলাই রাতে মেহেরপুর র্যাব ক্যাম্পের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়া পরিচালনার অভিযোগে আরিফুল ইসলাম (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেন। পরে জুয়া প্রতিরোধ আইনের একাধিক ধারায় মামলা দিয়ে তাকে গাংনী থানায় সোপর্দ করা হয়।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে র্যাবের হোয়াটসঅ্যাপ মিডিয়া গ্রুপে অভিযানের তথ্যের সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তির মুখ অস্পষ্ট করা একটি ছবি পাঠানো হয়। পরে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী স্পষ্ট ছবি চাইলে গ্রুপের অ্যাডমিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, “মিডিয়া নীতিমালা এবং কোর্ট অর্ডারের কারণে র্যাবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ছবি সরবরাহ করা সম্ভব নয়।”
কিন্তু কিছুক্ষণ পরই দেখা যায়, একই ছবির স্পষ্ট সংস্করণ ব্যবহার করে দুই-একটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় কয়েকটি ফেসবুক পেজ ও টিকটকেও সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এতে মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীরা র্যাবের মিডিয়া গ্রুপে প্রতিবাদ জানান। একপর্যায়ে গ্রুপে অন্য সদস্যদের বার্তা লেখার অপশন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে গাংনী প্রেসক্লাবের সভাপতি তৌহিদ উদ দৌলা রেজা বলেন, ‘বর্তমান সময় অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগ। র্যাব যদি তাদের অভ্যন্তরীণ নীতিমালার কারণে কোনো তথ্য প্রকাশ না করে, সেটি তাদের নিজস্ব বিষয়। তবে প্রশ্ন তখনই তৈরি হয়, যখন গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য খোলা মিডিয়া গ্রুপে অভিযানের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সময়মতো দেওয়া হয় না, কিংবা এমন সময়ে দেওয়া হয় যখন সংবাদ প্রকাশের সুযোগ প্রায় শেষ হয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘সরকার যখন ফেসবুকভিত্তিক পেজে অপতথ্য ও গুজব প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে, তখন র্যাবের মতো একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী স্বীকৃত গণমাধ্যমের আগে স্থানীয় ফেসবুক পেজ বা টিকটক কনটেন্ট নির্মাতাদের কাছে ছবি, ভিডিও ও তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে৷ এটি কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মেহেরপুরে র্যাব সদস্যরা সদর দপ্তরের কোনো নির্দেশনার ভিত্তিতে এমনটি করছেন কি না, সেটিও স্পষ্ট করা দরকার।’
মেহেরপুর জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব চান্দু বলেন, ‘তথ্যপ্রবাহে বৈষম্য এখন একটি গুরুতর সমস্যা। বিষয়টি শুধু র্যাবের মিডিয়া গ্রুপে নয়, জেলা পুলিশের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। অধিকাংশ সময় মোবাইল ও বিকাশ প্রতারণার টাকা উদ্ধারের মতো সীমিত কয়েকটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য মূলধারার গণমাধ্যমের কাছে পৌঁছায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাও সস্তা প্রচারণার আশায় পেশাদার সংবাদমাধ্যমকে উপেক্ষা করে ফেসবুক পেজ ও টিকটকভিত্তিক প্ল্যাটফর্মকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এতে একদিকে মূলধারার সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি তথ্য বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সরকারের তথ্য উন্মুক্তকরণের নীতির সঙ্গে এ ধরনের আচরণ সাংঘর্ষিক। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেহেরপুর র্যাব-১২, সিপিসি-৩-এর কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদীপ্ত সরকার বলেন, ‘বিষয়টি আমার আগে জানা ছিল না। আজ আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে যে, প্রকৃত গণমাধ্যম কর্মীদের কেউ ছবি পাচ্ছেন, কেউ পাচ্ছেন না। আবার বিভিন্ন ফেসবুক পেজের অ্যাডমিনদের কাছেও ছবি ও ভিডিও চলে যাচ্ছে। আমি দায়িত্ব নিয়েই বলছি, ভবিষ্যতে আর এমনটি হবে না। তথ্য ও ছবি বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।’