চুয়াডাঙ্গার সন্তান এন. এন. সাহার নকশা করা রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম স্বাধীনতার পর থেকে সরকারি দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, তাঁর অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে দেওয়া হোক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও জাতীয় সম্মাননা।
চুয়াডাঙ্গার মাটিতে জন্ম নেওয়া এন. এন. সাহার নাম বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। সরকারি দপ্তরের নথিপত্র, চিঠিপত্র ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের নকশাকার হিসেবে বিভিন্ন সংবাদ ও তথ্যসূত্রে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ তাঁর পরিবার বলছে, স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি মেলেনি।
এন. এন. সাহার পরিবারের সদস্যরা ২০২৬ সালের আগস্টে এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও জাতীয় সম্মাননার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁদের বক্তব্য, রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতীকের নকশার সঙ্গে যুক্ত এই ব্যক্তির জীবন ও মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা সরকারি উদ্যোগে যাচাই করে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের নকশা
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনের প্রধান উপদেষ্টা ডা. আসহাব উল হকের উদ্যোগে রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামযুক্ত সিলমোহর তৈরির প্রয়োজন দেখা দিলে এন. এন. সাহা এর একটি নকশা তৈরি করেন।
পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ তাঁকে এ বিষয়ে কাজের জন্য ডেকে পাঠানো হয়। পরে তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনের ব্যবহৃত মনোগ্রামের ধারণা পরিবর্তন করে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ লেখা এবং মাঝখানে বাংলাদেশের মানচিত্র সংবলিত একটি নকশা তৈরি করেন। এই বিবরণটি মূলত তাঁর পরিবারের বক্তব্য ও স্থানীয় সংবাদপ্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রচারিত হয়েছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামে লাল বৃত্তের মধ্যে হলুদ রঙের বাংলাদেশের মানচিত্র রয়েছে। বৃত্তের ওপর ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ এবং নিচে ‘সরকার’ লেখা থাকে। দুই পাশে রয়েছে দুটি করে মোট চারটি তারকা। বিভিন্ন বাংলাদেশি তথ্যসূত্রে এই মনোগ্রামের নকশাকার হিসেবে এ. এন. সাহা বা এন. এন. সাহার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—”রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীকের সমার্থক নয়।” বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীকের নকশাকার হিসেবে পটুয়া কামরুল হাসানের নাম সরকারি ও প্রচলিত তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়; রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের নকশাকার হিসেবে আলাদাভাবে এন. এন. সাহার নাম পাওয়া যায়।
ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার দাবি
বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের প্রতিবেদনে এন. এন. সাহাকে ভাষাসৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের প্রণেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জাতীয় গেজেট, মুক্তিবার্তা ও ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্তির দাবিও করা হয়েছে। তবে এসব নথির মূল সরকারি কপি এই প্রতিবেদনের জন্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট নথির বিষয়ে সরকারি রেকর্ডের সরাসরি উদ্ধৃতি ছাড়া অতিরিক্ত দাবি না করাই সংগত।
স্থানীয়ভাবে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সম্মাননা দেওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়। ২০২০ সালের একটি প্রতিবেদনে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য এন. এন. সাহার পক্ষে তাঁর ছেলে চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু সম্মাননা গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্মাননার দাবি
এন. এন. সাহার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে তাঁর অবদানের রাষ্ট্রীয় মূল্যায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। ২০২৬ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনেও পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের প্রণেতা হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি, মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার মূল্যায়ন এবং জাতীয় সম্মাননা দেওয়ার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে তাঁর নামে সড়কের নামকরণ ও তাঁর জীবন-কর্ম নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার দাবিও জানানো হয়েছে।
তবে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা হিসেবে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত তালিকায় এন. এন. সাহার নাম পাওয়া যায়নি। এটি অবশ্য তাঁর অন্য কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেই—এমন চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; বরং অন্তত স্বাধীনতা পুরস্কারের প্রকাশ্য তালিকায় তাঁর নাম নেই।
পরিবারের বর্তমান পরিস্থিতি
এন. এন. সাহা ২০০২ সালের ২ সেপ্টেম্বর চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতিবছর পরিবারের পক্ষ থেকে স্মরণ ও স্বীকৃতির দাবি সামনে আসে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
তাঁর স্ত্রী বিমলা বালা সাহাও পরে মারা যান। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে পুত্র মনোজ কুমার সাহা ২০২৫ সালের জুনে মারা যান। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর অপর দুই পুত্র চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু ও রতন লাল সাহার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে ২০২৬ সালের সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়েছে, তাঁরা আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে এন. এন. সাহার অবদানের মূল্যায়ন ও পরিবারের প্রতি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। এই আর্থিক সংকটের দাবিটি পরিবারের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
ইতিহাসের নেপথ্যের মানুষকে স্বীকৃতির প্রশ্ন
একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক পরিচয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত কোনো প্রতীকের নকশাকার কে ছিলেন—এই প্রশ্ন শুধু ব্যক্তিগত সম্মানের নয়, ইতিহাস সংরক্ষণেরও বিষয়। এন. এন. সাহার ক্ষেত্রে তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের দাবি এবং ২০২৬ সালের নতুন করে করা আবেদন সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে।
তবে তাঁর ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম প্রণয়নের ইতিহাস নিয়ে সরকারি নথি, মুক্তিযুদ্ধের দলিল ও সংশ্লিষ্ট আর্কাইভ আরও অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্য ইতিহাস তৈরি করা প্রয়োজন।
চুয়াডাঙ্গার মানুষের প্রত্যাশা, সরকার এন. এন. সাহার অবদান ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের ইতিহাস ও এর নকশাকারের পরিচয় যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক পরিচয় নির্মাণের নেপথ্যের ইতিহাস সম্পর্কেও জানতে পারবে।