জনবল সংকটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার এখন বেহাল অবস্থা। খুঁড়িয়ে খঁড়িয়ে চলছে এর শিক্ষা কার্যক্রম।
উপজেলার ২১৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মধ্যে প্রায় দেড়শো প্রধান শিক্ষকের পদই এখন খালি। প্রধান শিক্ষক আছেন মাত্র ৬৯জন।
১১জন সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ১জন। দাপ্তরিক কাজকর্ম করার কোন লোকবলেও সংকট। উচ্চমান সহকারির একমাত্র পদটি শূন্য। অফিস সহকারী, কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের ৩টি পদই ফাঁকা। অফিস সহায়কের ১ জনের পদও শূন্য।
গত কয়েক মাস ধরে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পদশূন্য থাকলেও অফিসের করণিকপদগুলো শূন্য ২ বছর ধরে। সব মিলিয়ে বেহাল এই উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা। অতিরিক্ত কাজের চাপে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অফিসের হিসাব সহকারী আবু হানিফ। ফলে জেলার বৃহৎ এই উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার এখন বেহাল দশা।
উপজেলা কমপ্লেক্সেও প্রবেশ মুখে তিন তলা বিশিষ্ট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসটি। মানুষের আনাগোনও কম। শিক্ষকরা এসে ফাইলপত্র নিয়ে নিজেদের কাজ নিজেরাই করেন। টেবিলে ফাইলের স্তুপ।
জনবল কাঠামো অনুসারে একজন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ছাড়াও এখানে থাকার কথা ১১ জন উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার ১০টি পদই শুন্য। ফলে ২১৯ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ হাজার ৪শত শিক্ষক আর প্রায় ৫৫হাজার শিক্ষার্থীকে সঠিকভাবে মনিটরিং করা যাচ্ছেনা।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের হিসাব সহকারী মোঃ আবু হানিফ জানান, অতিরিক্ত কাজের চাপে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তার জীবন। তিনি বলেন, ২০১২ সালে এখানে যোগদান করার সময় ৪ জন ছিলাম আমরা। তখন শিক্ষক সংখ্যা কম ছিলো। ৫/৬শ শিক্ষক ছিলো। আইটি ব্যাজ এতো কাজ ছিলোনা। ৪জনে সুন্দরভাবে অফিস পরিচালনা করেছি। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ৩ জন অবসরে চলে যাওয়ার পর আমরা আরো ২জন ছিলাম। ২০২৪ সাল পর্যন্ত দু’জনে অফিস চালিয়েছি। অফিস প্রধান ইউডি কাম একাউন্ট্যান্ট বদলী হয়ে চলে যান কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে। এরপর থেকে গত ২ বছর ধরে আমি একা। উপজেলায় ২১৯টি স্কুল। প্রায় ১ হাজার ৪শত শিক্ষক। ১শত জন দফতরী। দেড় হাজার জনবলের প্রশাসনিক-আর্থিক যাবতীয় কাজ আমাকে একা সামলাতে হচ্ছে। যে কারনে আমার স্বাস্থ্যের ওপর অনেক প্রেসার পড়ছে। অলরেডি আমার ঘাড়ের দুটি রগ বøক খেয়ে রয়েছে। আমার ডায়াবেটিক, উচ্চ রক্তচাপ আছে। লিভারের সমস্যা আছে। শ্বাসকষ্টও আছে। এমন পরিস্থিতি যদি আর কিছুদিন চলে মনে হয়না আমি আর অফিস করতে পারবো।
তিনি বলেন, শিক্ষকদের প্রশাসনিক, আর্থিক এবং দৈনন্দিন অন্যান্য কাজ রয়েছে। এখানে প্রচুর কাজ। ৪টা পদ পূরন না হলে শিক্ষার মান উন্নয়ন কিছুতেই সম্ভব নয়।
উপজেলার আতিয়ারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল খালেক বলেন-উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অনেক সমস্যা। ১১ জন সহকারী শিক্ষা অফিসারের প্রয়োজন। ওই জায়গায় একজন সহকারী শিক্ষা অফিসার দিয়ে গোটা নবীনগরের কার্য্যক্রম চলছে। অফিসে ৬/৭ জন দরকার। সেখানে ১জনের পক্ষে খুবই কষ্টকর। ২১ ইউনিয়নে বিদ্যালয় পরিদর্শন একজনের পক্ষে কাভার করা খুবই কষ্টকর। বিভিন্ন উপজেলা থেকে লোকজন এনে অফিসিয়াল কাজ করতে হয়।
তিনি বলেন, আমি ৩৮ বছর ধরে শিক্ষকতা করি। এমন দুর্ভোগ শিক্ষা অফিসে কোন সময় দেখিনি।
উপজেলার গোসাইপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাম্মৎ তাসলিমা জাহান জানান-আমাদের অফিসে ষ্টাফের সমস্যা দীর্ঘ দিন ধরে। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য। প্রশাসনিক কাজ করতে ঝামেলা পোহাতে হয়। সঠিকভাবে করা যায়না। স্যার ভিজিটে থাকে। অফিসে অপেক্ষা করতে হয়। অভাব-অভিযোগ ঠিকমতো উপস্থাপনও করতে পারেনি।
উপজেলার শ্যামগ্রাম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ডালিয়া সুলতানা বলেন-সহকারী শিক্ষা অফিসার ১১ জনের জায়গায় ১জন আছেন,সমস্যাতো হবেই। অফিসে আগে ৫/৭জন ক্লার্ক ছিলো। দাপ্তরিক কাজে সমস্যা হয় আমাদের।
উপজেলার আশ্রাফপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরজুদা বেগম বলেন,আমাদের উপজেলা ২১ ইউনিয়ন নিয়ে। এটিইও (উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার) দরকার ১১জন। আমাদের ৮টা সাব ক্লাষ্টার। নূন্যতমতো ৮টা সাব ক্লাষ্টারের জন ৮জন এটিইও দরকার। আছে মাত্র ১জন। প্রাতিষ্ঠানিক বলেন, পড়ালেখা বলেন অনেক অসুবিধা। শারিরীক অসুস্থতায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রয়েছেন ছুটিতে। উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ মানিক ভূইয়া একাই সামলাচ্ছেন সব। তিনি জানান-৭ মাস ধরে সহকারী শিক্ষা অফিসার হিসেবে একাই দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অফিস ষ্টাফের পদও শূন্য। এতে কাজে অনেক সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া ২১৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৫০ বিদ্যালয়েই নেই প্রধান শিক্ষক। সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য রয়েছে দেড়শোর মতো। এলাকার প্রাথমিক শিক্ষার এই দূরাবস্থার বিষয়টি সম্প্রতি সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান সংসদে তুলে ধরেছেন।
এ ব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ডিপিও) মোঃ শামসুর রহমান জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে প্রায় দেড়শো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালানো হচ্ছে। উপজেলা সহকারি শিক্ষা কর্মকর্তা, অফিস ক্লাক সংকটের কথা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। এসব শুন্যপদে নিয়োগ দেয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছি।
