কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে ব্রিটিশ শাসন আমলের নীল চাষের নির্মম নির্যাতনের ইতিহাস বিজড়িত ২৬৫ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ‘নীলকুঠি’ নামক বাড়িটির স্মৃতিচিহ্ন আজও কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাগৈতিহাসিক ওই স্থাপনাটি দেখতে প্রতিদিনই পর্যটকদের ভীড় বাড়লেও নীলকুঠি বাড়িটি এখন সংস্কারের অভাবে বিলুপ্তির পথে। তাই ঐতিহাসিক ওই নীলকুঠি বাড়িটি সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা,সুশীল সমাজ ও সচেতনমহলের লোকজন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়,জেলার হোসেনপুর উপজেলার দুই নম্বর সিদলা ইউনিয়নের চৌদার এলাকায় তৎকালীন নীলকরদের আবাসস্থল,টান সিদলা গ্রামে নীলকুঠির কার্যালয় ও বিশাল পুকুরটি ইংরেজদের সেসময়কার নানা স্মৃতি বহন করে চলেছে। কথিত আছে বাংলার তদানীন্তন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের নামানুসারে হোসেনপুর নামকরণের পর ব্রহ্মপুত্র নদের পুর্ব তীরে গড়ে উঠেছিল ঐতিহাসিক ওই ‘নীলকুঠি’।

ইতিহাসবিদদের ভাষ্যমতে,আনুমানিক ১৭৩০ থেকে ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হোসেনপুরে নীলকুঠি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর জোরপূর্বক কৃষকদের বাধ্য করে নীলের চাষ শুরু করে। ওই সময়ে এই অঞ্চল থেকে ইংল্যান্ডে প্রচুর নীল রপ্তানি করা হতো। এ অঞ্চলের কৃষকদের উপর অত্যাচার ও নিপীড়ন করে জোরপূর্বক নীল চাষের বিস্তার ঘটায় । প্রথম দিকে ইংরেজরা নীলের ব্যবসায় অধিক লাভ করলেও পরে ওই ব্যবসায় ধস নেমে আসে। সূত্রমতে,এখানে নীলকর ওয়াইজস্টিফেন্স ছিলেন এ অঞ্চলের মালিক ও ব্যবসায়ী।

পুরনো ঢাকার আরমানিটোলার আর্মানিয়ান ইংরেজ খ্রিষ্টান আর্মোনিয়ান আরাতুন দুই কন্যা ও তার আত্বীয়-স্বজনদের নিয়েই হোসেনপুরে নীলকুঠির ব্যবসা সচল রাখতেন। সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহকালে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী হোসেনপুর আদর্শ মহিলা কলেজের ইতিহাস বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এমএ হাকিম জানান, ইংরেজ আমলে ফ্রান্সের অধিবাসী মাইকেল প্যাটেল হোসেনপুর উপজেলার সিদলা ইউনিয়নের চৌদার এলাকায় কারুকার্যময় একটি আলিশান বাড়ি তৈরি করেন। এই বাড়িতে অবস্থান করেই এলেনবেথ হেনসন পরবর্তীতে এ অঞ্চলে নীল চাষ নিয়ন্ত্রণ করতেন। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর নীলকুঠি বাড়িটি কিশোরগঞ্জের সাবেক জেলা সমবায় অফিসার প্রয়াত উম্মেদ আলী খরিদ সূত্রে/ লীজ সূত্রে মালিকানা লাভ করে বাড়িটির নাম দেন আমেনা মঞ্জিল।

বর্তমান বাড়িটি আমেনা মঞ্জিল হিসেবেই সমুধিক পরিচিত। বাড়িটি দেখতে খুব সুন্দর। উপজেলার টান সিদলা বাবুর বাজার এলাকায় নীলকর কার্যালয়ের ধংসাবশেষ ও কার্যালয়ের পূর্ব দিকে সে আমলের একটি বিশাল পুকুর অযত্ন ও অবহেলায় এখনো কালের সাক্ষী হয়ে আছে। হোসেনপুর সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক,লেখক ও গবেষক এবিএম ছিদ্দিক চঞ্চল, পৌর এলাকার দ্বীপেশ্বর গ্রামের শতবর্ষী প্রবীণ বাসিন্দা টুনু মুন্সি, নামা সিদলা গ্রামের শিক্ষক বিল্লাল মিয়া, সাহেবের চর গ্রামের কুদরত আলীসহ অনেকেই জানান,ব্রিটিশ আমলে নীলকর শাসকদের ভয়ে সবাই ফসলি জমিতে নীল চাষ করতে বাধ্য হয়েছিল।

তবে যেসব চাষীরা নীল চাষ করেনি তারা নীলকরদের দ্বারা নিদারুণ নির্যাতিত ও অত্যাচারিত হতে হয়েছে। উপজেলার সিদলা ইউনিয়নের গড়মাছুড়া গ্রামের সমাজকর্মী মোঃ ওয়াহিদ মিয়াসহ স্থানীয়রা জানান, সেসময়ে ইংরেজদের বর্বরোচিত জুলুম-নির্যাতনের ইতিহাসকে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য ওই নীলকুঠি সংস্কারণ অতীব জরুরি। তাই এবিষয়ে তারা প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী নাহিদ ইভা জানান, উপজেলায় যোগদানের পর যতটুকু জানতে পেরেছি, নীলকুঠি’টি বহু বছরের পুরোনো ইতিহাস ঐতিহ্য বহন করছে । তাই এখানে ইংরেজদের অনেক স্মৃতি বিজড়িত রয়েছে। ওই নীলকুঠিটি শিঘ্রই পরিদর্শন করে সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।