রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিশুতোষ কবিতা ‘মাকাল’-এ উল্লেখ পাওয়া যায় মাকালের। একসময় গ্রামবাংলার বন-জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে সহজেই দেখা মিলত লাল রঙের এই ফলের। কিন্তু বন উজাড়, পরিবেশের পরিবর্তন এবং রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে মাকাল। ফলে পাঠ্যপুস্তকে এর নাম থাকলেও বাস্তবে নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই ফলটি অচেনা।
উদ্ভিদবিদদের তথ্য অনুযায়ী, মাকালের বৈজ্ঞানিক নাম Trichosanthes tricuspidata। ধারণা করা হয়, এর আদি নাম ছিল ‘মহাকাল’, যা সময়ের পরিক্রমায় পরিবর্তিত হয়ে ‘মাকাল’ নামে পরিচিতি পায়।
মাকাল একটি বহুবর্ষজীবী লতাজাতীয় উদ্ভিদ। সাধারণত বন-জঙ্গল কিংবা বড় গাছকে আশ্রয় করে এটি বেড়ে ওঠে এবং পূর্ণবয়স্ক লতা ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পাতার কক্ষে সাদা ফুল ফোটে। ফল প্রথমে গাঢ় সবুজ, পরে হলুদ এবং পাকলে উজ্জ্বল লাল রঙ ধারণ করে। দেখতে অনেকটা ছোট আপেল বা ডিমের মতো হলেও ভেতরের অংশ কালচে ও তিতা স্বাদের।
কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় অনেকে মাকালকে ‘কাওয়াকাডি’ নামেও চেনেন। একসময় জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাকালের বীজ ও অন্যান্য অংশ থেকে তৈরি প্রাকৃতিক বিষ কৃষিজমিতে পোকামাকড় দমনে ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমানে রাসায়নিক কীটনাশকের বিস্তারের কারণে সেই ব্যবহার প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
স্থানীয় বৃক্ষপ্রেমী মো. নবী হোসেন জানান, লোকজ চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে মাকাল গাছের শিকড়, কাণ্ড, ফল ও বীজ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাঁর দাবি, কোষ্ঠকাঠিন্য, বদহজম, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বাত-ব্যথা, জন্ডিস, প্রস্রাবজনিত সমস্যা এবং ত্বকের কিছু রোগের চিকিৎসায় এটি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বীজের তেল চুলের পরিচর্যা এবং ঐতিহ্যগতভাবে সাপ বা বিছার কামড়ের লোকজ চিকিৎসায়ও ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। তবে এসব ব্যবহারের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার যথেষ্ট প্রমাণ এখনো সীমিত।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, অতীতে মাকালের বীজ ও আঁশ শুকিয়ে গুঁড়া করে পানিতে মিশিয়ে জমিতে প্রয়োগ করা হতো। এটি ফসলের কিছু পোকামাকড় ও ইঁদুর দমনে প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। হোসেনপুর অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে এই পদ্ধতির ব্যবহার একসময় বেশ জনপ্রিয় ছিল।
প্রকৃতিবিদদের মতে, মাকাল সাধারণত ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বন-জঙ্গল ও ঝোপঝাড়ে জন্মায়। তবে বনভূমি উজাড়, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে গত এক দশকে এর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে ভবিষ্যতে এ উদ্ভিদ সংরক্ষণ না করা হলে এটি আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়তে পারে।
স্থানীয় পরিবেশবিদ অধ্যাপক এবিএম ছিদ্দিক চঞ্চল বলেন, “প্রাকৃতিক বনভূমি ধ্বংস এবং রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে মাকালের গুরুত্ব কমে গেছে। একসময় কৃষকেরা যে প্রাকৃতিক উপায়ে ফসল রক্ষা করতেন, তা এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। দেশীয় এই মূল্যবান উদ্ভিদ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”
পরিবেশবিদদের মতে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং দেশীয় উদ্ভিদ রক্ষায় মাকালের মতো বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি।