যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত প্রশমনে একটি ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেইনসে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের সময় এই সমঝোতা কার্যকর হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমঝোতার আওতায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

Advertisement

সমঝোতার ১৪টি প্রধান শর্ত

১. সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখবে।

২. সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান

উভয় দেশ একে অপরের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে।

৩. অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা
কোনো পক্ষই অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।

৪. ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির চেষ্টা

সমঝোতার ভিত্তিতে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা চলবে।

৫. প্রয়োজনে সময়সীমা বাড়ানো
উভয় পক্ষের সম্মতিতে আলোচনার সময়সীমা আরও বাড়ানো যেতে পারে।

৬. নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার শুরু
চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ শিথিল করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

৭. ৩০ দিনের মধ্যে অবরোধ প্রত্যাহার

যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ-অবরোধ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবন্ধকতা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে।

৮. হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা
ইরান হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক ও নিরাপদ করবে।

৯. কোনো মাশুল বা ফি আরোপ না করা
হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে অতিরিক্ত মাশুল বা ফি নেওয়া হবে না।

১০. মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো
চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের আশপাশের এলাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহারের পদক্ষেপ নেবে।

১১. ইরানের পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা

ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও অর্থায়ন কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

১২. পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার
ইরান কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার মেনে চলবে।

১৩. সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের আন্তর্জাতিক তদারকি
ইরানের বিদ্যমান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ, হ্রাস বা অপসারণের আওতায় আনা হবে।

১৪. নিষেধাজ্ঞা শিথিল, জব্দ অর্থ ফেরত ও আন্তর্জাতিক তদারকি

চূড়ান্ত সমঝোতার অগ্রগতির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং চুক্তি বাস্তবায়ন তদারকির জন্য বিশেষ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

নতুন কুটনৈতিক অধ্যায়ের ইঙ্গিত

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তিটিকে ‘পারফরম্যান্স-ভিত্তিক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। অর্থাৎ ইরান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলে ধাপে ধাপে সুবিধা কার্যকর হবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, সমঝোতার বহু ধারা এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছেনি। ফলে এটি কতটা কার্যকর হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ আলোচনা ও দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।

উল্লেখ্য, সমঝোতা-সংক্রান্ত তথ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পূর্ণাঙ্গ সরকারি নথি ও স্বাধীন যাচাই ছাড়া এসব শর্তের চূড়ান্ত সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।