ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় আদালতের নির্দেশে বিরোধপূর্ণ জমি বুঝিয়ে দিতে গিয়ে বাধা ও হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছে একটি পরিবার। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা সাংবাদিকদের কাছে এ অভিযোগ তুলে বিচার দাবি করেন। তাঁদের অভিযোগ, জমি বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগের সময় স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতা-কর্মী পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ান এবং বাদীপক্ষের লোকজনের ওপর হামলা করেন।
তবে ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাইও করা সম্ভব হয়নি।
আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে বাধার অভিযোগ
ভুক্তভোগী পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারাকান্দা উপজেলার কাকনীকোনা মৌজায় এক একর পুকুরশ্রেণির জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। প্রায় দুই বছর আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালতের নির্দেশে জমিটি প্রথম পক্ষের আবদুর রাজ্জাককে বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরিবারটির দাবি, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তারাকান্দা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয় বিশকা ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক লিটন মন্ডল, সুমন সরকার, অলি এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি বাধা দেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাঁদের বাকবিতণ্ডা হয়। পরে বাদীপক্ষের লোকজনের ওপর হামলা চালানো হয় বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, স্থানীয় কয়েকজনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হওয়া থেকে রক্ষা পায়। তবে ঘটনার সময় ঠিক কী ঘটেছিল এবং কেউ আহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আদালতের নথিতে কী রয়েছে
পরিবারের দেখানো আইনি নোটিশের তথ্য অনুযায়ী, বিবিধ কোর্ট দরখাস্ত নং ২৫৭/২০২৫ এবং স্মারক নং ৪১৩৬-এর সূত্রে ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারার অধীনে তারাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে তারাকান্দা উপজেলার কাকনীকোনা মৌজার এক একর পুকুরশ্রেণির জমি প্রথম পক্ষের মো. আবদুর রাজ্জাককে বুঝিয়ে দেওয়া এবং দ্বিতীয় পক্ষ যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে বলে পরিবারটি জানিয়েছে।
নোটিশটি জারি করেন তারাকান্দা থানার উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) লিটন চন্দ্র পাল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে আদালতের আদেশের সঠিক ভাষা, জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশের পরিধি এবং আদেশ বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া মূল নথি দেখে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বাদীপক্ষের বক্তব্য
মামলার বাদী মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, দীর্ঘদিন আইনি লড়াইয়ের পর আদালতের নির্দেশনা পেয়ে তিনি জমি বুঝে নিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় কয়েকজনের বাধার কারণে তা সম্ভব হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং ন্যায়বিচার দাবি করেন।
রাজ্জাকের ছেলে রুবেল মিয়া অভিযোগ করেন, লিটন মন্ডল, অলি, বিপ্লব, সেকান্দর, আবদুল হাকিম, কাজল ও নয়ন মিয়াসহ কয়েকজন তাঁদের জমিতে প্রবেশ করে হামলার চেষ্টা করেন। তাঁর দাবি, পুলিশের সামনেই তাঁকে মারতে তেড়ে আসা হয়। স্থানীয় লোকজন হস্তক্ষেপ করায় তাঁরা রক্ষা পান।
রুবেল আরও অভিযোগ করেন, আদালতের নির্দেশের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে জমির বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
পরিবারের সদস্য ফাতেমা আক্তার ও আয়েশা আক্তার বলেন, নিজেদের জমি নিয়ে বিরোধের কারণে তাঁরা অন্যের জায়গায় আশ্রিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। জমি বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তাঁরা হতাশ। তাঁরা জমি ফিরে পাওয়া অথবা স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা এবং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।
তাঁরা আরও অভিযোগ করেন, আর্থিক লেনদেনের কারণে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অভিযুক্তদের বক্তব্য ও পুলিশের অবস্থান
অভিযুক্ত বিএনপি নেতা লিটন মন্ডলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ক্যামেরার সামনে বা আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দিতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। অন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
ঘটনার বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, তাঁরা বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন। এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং আদালতের নির্দেশনা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের পর দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের নথি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগে কী ঘটেছিল, তা আরও স্পষ্ট হবে।