ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের নতুন আটতলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে ঘটনাস্থল না দেখেই হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি এম ইকবাল হোসেইন। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালে গিয়ে তিনি প্রশাসনিক ভবনে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করলেও অগ্নিকাণ্ডের স্থান এবং ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত রোগী-স্বজনদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেননি।
গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় আগুন লাগে। আগুন ও ধোঁয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে হুড়োহুড়ির ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়।
তবে বুধবার হাসপাতাল পরিদর্শনের পর ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ দাবি করেন, পদদলিত বা অগ্নিদগ্ধ হয়ে কেউ মারা যাননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুজন আতঙ্কের মধ্যে মারা গেছেন এবং অন্য দুজনের মৃত্যু স্বাভাবিক কারণে হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, ছয়জনের মৃত্যুর যে তথ্য ছড়িয়েছে, তার মধ্যে একজন এখনো চিকিৎসাধীন।
অন্যদিকে, ঘটনার পর প্রকাশিত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছিল। ফলে নিহতের সংখ্যা ও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে।
রুদ্ধদ্বার বৈঠক
প্রতিমন্ত্রীর সফরসূচিতে বুধবার সকাল পৌনে ১০টায় মমেক হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে পরিদর্শনের কথা ছিল। তবে তাঁর গাড়িবহর হাসপাতালে পৌঁছায় সকাল ১১টা ১০ মিনিটে।
হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলামসহ চিকিৎসক নেতারা তাঁকে স্বাগত জানিয়ে প্রশাসনিক ভবনে পরিচালকের কক্ষে নিয়ে যান। অসুস্থতার কারণে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহা. জাকির হোসেন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না।
বৈঠকে ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, হাসপাতাল প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং চিকিৎসক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে দুপুর ১২টা ২২ মিনিটে বেরিয়ে আসেন প্রতিমন্ত্রী।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, মূলত এসব বিষয় নিয়েই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ড ও হতাহতের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রীর পাশে থাকা সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ মৃত্যুর সংখ্যা ও কারণ নিয়ে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন। তবে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর দাবি রয়েছে—এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন বলেন, “বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কমিটি হয়েছে। তারা তদন্ত করার পর যেটা বের হবে, তখন প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারব।”
নতুন তদন্ত কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের কারণ, হতাহতের ঘটনা এবং সম্ভাব্য গাফিলতি খতিয়ে দেখতে আগে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পরে সেটি বাতিল করে বুধবার নতুন ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। নতুন কমিটিকে আগুনের কারণ, কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
নতুন কমিটির প্রধান করা হয়েছে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে। কমিটিতে হাসপাতালের চিকিৎসক ছাড়াও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধিকে রাখা হয়েছে।
রোগীর চাপ ও অবকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন
পরিদর্শনকালে সাংবাদিকরা হাসপাতালের স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম অকেজো থাকার বিষয়েও প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
জবাবে তিনি বলেন, এসব সমস্যার সমাধান একদিনে সম্ভব নয়। প্রকৌশলীদের প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, হতাহতের সংখ্যা ও মৃত্যুর ধরন নিয়ে বর্তমানে যে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে, তার নিরসন তদন্ত প্রতিবেদনেই হওয়ার কথা। নতুন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের পরই ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।