মেঘনাপারের জনপদ চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা বাজার। এই বাজারের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী ‘রূপসা জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ’।
স্থানীয়দের কাছে ‘মসজিদে নূর’ নামে পরিচিত এই স্থাপনাটি কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং দুই শতাব্দী ধরে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে এক বিস্তৃত জনপদে। ১২৮৪ বঙ্গাব্দে নির্মিত এই মসজিদটি আজ ইসলামি স্থাপত্যকলার অনন্য এক নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে।
বৃহত্তর মেঘনাপারের তৎকালীন প্রভাবশালী জমিদার মোহাম্মদ গাজী চৌধুরী আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও স্থানীয় মুসল্লিদের ইবাদতের সুবিধার্থে এই মসজিদটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। সে সময়ে প্রায় বিশ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই নান্দনিক স্থাপনাটি আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল। মসজিদের প্রবেশপথের পাশে শ্বেতপাথরে ফার্সি ভাষায় খোদাই করা লিপি যেন এই অঞ্চলের ইতিহাসের এক স্থায়ী দলিল।
৪৭ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৪০ ফুট প্রস্থের মূল মসজিদের সামনে রয়েছে ৫৩ বাই ৩০ ফুটের দেয়ালবেষ্টিত এক প্রশস্ত চত্বর। মসজিদটির ছাদের সামনের অংশে তিনটি বড় গম্বুজসহ পুরো স্থাপনায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৩৯টি গম্বুজ রয়েছে। এর মার্বেল পাথরের সূক্ষ্ম কারুকাজ, শৈল্পিক নকশা ও সুষম গঠনশৈলী যেকোনো দর্শনার্থীকে মুগ্ধ করে। প্রতিটি খিলান ও অলংকরণ যেন নির্মাতা মোহাম্মদ গাজী চৌধুরীর গভীর ঈমানি অনুভূতির প্রতিচ্ছবি।
মসজিদের পশ্চিম পাশে রয়েছে শানবাঁধানো ঘাটসহ একটি সুবিশাল দিঘি। আজও সেই দিঘির পবিত্র জলে ওজু করেন মুসল্লিরা। দিঘির পানির কলতান, পাখির কিচিরমিচির আর আজানের সুর মিলেমিশে সেখানে এক অপার্থিব প্রশান্তির পরিবেশ তৈরি করে৷
সময়ের প্রয়োজনে মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে তিন দফায় মসজিদটির আয়তন বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে এখানে একসাথে প্রায় পাঁচশ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বিশেষ করে রমজান মাসে তারাবির সময় মসজিদ প্রাঙ্গণ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে।
মসজিদের খতিব মাওলানা মো. আবদুর রহমান বলেন, ‘এই মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়, এটি আমাদের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে দাঁড়ালে মনে হয় আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের দোয়ার সাথেই যুক্ত হয়ে যাই।’
রূপসা বাজারের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে এই মসজিদ এক গভীর ভালোবাসার নাম। স্থানীয় বাসিন্দা শামীম হোসেন বলেন, ‘রূপসা বাজারের পরিচয়ই যেন এই মসজিদ। বাইরে থেকে কেউ এলে আমরা গর্বের সাথে তাদের মসজিদটি দেখাই। এটি কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এটি আমাদের বিশ্বাস ও ইতিহাসের সাক্ষী।’
জমিদার পরিবারের উত্তরসূরি এবং ‘মোহাম্মদ গাজী চৌধুরী ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মেহেদী হাসান চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষ যে মহৎ উদ্দেশ্যে এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, আমরা সেই আমানত যথাযথভাবে রক্ষা করতে চাই। ঐতিহ্যের ধারা অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
দুই শতাব্দী পেরিয়ে আজও ঐতিহ্যের ধারক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদটি চাঁদপুরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক গর্বিত অধ্যায় হয়ে টিকে থাকুক যুগ যুগান্তর।
