চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত মরুভূমি অঞ্চলে দ্রুতগতিতে গড়ে ওঠা নতুন সামরিক অবকাঠামো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে চীনের পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করা এবং সম্ভাব্য শত্রুপক্ষের আগাম হামলার পরও কার্যকর পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা নিশ্চিত করা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীনের হামি পারমাণবিক সাইলো কমপ্লেক্সের আশপাশে নতুন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, সুরক্ষিত বাংকার, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং কমান্ড অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব স্থাপনা দেশটির বিদ্যমান পারমাণবিক সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা ও প্রতিশোধমূলক হামলা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Advertisement

মরুভূমিতে বিস্তৃত সামরিক নেটওয়ার্ক

বিশ্লেষকদের মতে, হামি অঞ্চলের আশপাশে ৮০টিরও বেশি কংক্রিটভিত্তিক উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম এবং একাধিক অষ্টভুজাকৃতির সামরিক স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। এসব স্থাপনার সঙ্গে রেলপথ, বিমানঘাঁটি, সুরক্ষিত অস্ত্রাগার এবং ভূগর্ভস্থ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সংযুক্ত রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলেকজান্ডার নিল, শাটল রাডার টপোগ্রাফি মিশন, ন্যাচারাল আর্থ ও ওপেনস্ট্রিটম্যাপ। রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট।

স্যাটেলাইট চিত্রে সাম্প্রতিক মহড়া, বড় সামরিক যানবাহনের উপস্থিতি এবং অস্থায়ী কাঠামোরও প্রমাণ মিলেছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এগুলোর কিছু অংশ ভ্রাম্যমাণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যবহৃত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন মাত্রা

তাইওয়ান প্রশ্ন, দক্ষিণ চীন সাগর এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চীনের পারমাণবিক অবকাঠামো সম্প্রসারণকে অনেক বিশ্লেষক কৌশলগত প্রতিরোধ নীতির অংশ হিসেবে দেখছেন।

চীনের মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি “দ্বিতীয় আঘাত” সক্ষমতা গড়ে তোলা, যাতে প্রতিপক্ষ প্রথম হামলা চালালেও দেশটি কার্যকরভাবে পাল্টা জবাব দিতে পারে।

হাওয়াইভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক ফোরামের সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক আলেকজান্ডার নিলের মতে, মরুভূমিজুড়ে যে বিস্তৃত অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে, তা চীনের কৌশলগত প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও বহুমাত্রিক ও টেকসই করে তুলতে পারে।

অষ্টভুজাকৃতির স্থাপনা ঘিরে কৌতূহল

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা অষ্টভুজাকৃতির তিনটি বড় স্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। এসব স্থাপনায় আবাসন, সামরিক যানবাহনের অবস্থান, সাঁজোয়া বাংকার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলেকজান্ডার নিল, শাটল রাডার টপোগ্রাফি মিশন, ন্যাচারাল আর্থ ও ওপেনস্ট্রিটম্যাপ। রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট।

পারমাণবিক নীতিবিষয়ক বিশ্লেষকদের ধারণা, এগুলো কমান্ড, নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। একই সঙ্গে পারমাণবিক বাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ ও অপারেশন সমন্বয়ের কাজেও এগুলোর ভূমিকা থাকতে পারে।

স্বচ্ছতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

চীনের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের একটি অভিযোগ হলো স্বচ্ছতার ঘাটতি। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরও গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

যদিও বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে “প্রথমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার” নীতি অনুসরণ করে বলে দাবি করে, পশ্চিমা কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, আঞ্চলিক সংঘাতের ক্ষেত্রে পারমাণবিক সক্ষমতাকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।

দ্রুত বাড়ছে পারমাণবিক সক্ষমতা

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে পারমাণবিক সক্ষমতা সম্প্রসারণ করছে চীন। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটি প্রায় এক হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েনের সক্ষমতা অর্জনের পথে রয়েছে।

এছাড়া আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার উন্নয়নও সমান্তরালভাবে চলছে।