আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসার যুগেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কমেনি তাবিজের ব্যবহার। গ্রামের সহজ-সরল মানুষ এখনো ঝাড়-ফুক, পড়াপানি ও তাবিজ-কবজকেই বিশ্বাস করেন। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন “চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাবিজের কোনো ভিত্তি নেই।
অন্যদিকে আধ্যাত্মিক জগতের বিশ্বাসীরা (আলেম, কবিরাজ, পীর মশায়েখ) বলেন, মানুষ জন্মলগ্ন থেকে জিন-ভ‚ত, নজর লাগাসহ নানা ধরনের রোগ বালাইয়ের জন্য তাবিজের ব্যবহার করে আসছেন।
গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষই এখনো কোন রোগ-বালাই বা অপশক্তির হাত থেকে নিজেদের রক্ষার জন্যে ঝাড়-ফুক, তাবিজ-কবজ, পড়াপানি উপরই নির্ভরশীল।
এদিকে মানুষ এখনো তাবিজের ব্যবহার করায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগরে গড়ে উঠেছে তাবিজ তৈরীর কারখানা। বিজয়নগর উপজেলার পত্তন ইউনিয়নের তেতুইয়া গ্রামে গড়ে উঠেছে তাবিজ তৈরীর তিনটি কারখানা। প্রতিদিন এসব কারখানায় উৎপাদিত হয় হাজার হাজার তাবিজ। এখানকার তৈরী তাবিজ জেলার বিভিন্ন গ্রামের দোকানে বিক্রির পাশাপাশি চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকার চক-বাজারসহ বিভিন্ন মার্কেটের দোকানে।
কারখানার শ্রমিকরা জানান, ডায়েসের মাধ্যমে স্টীলের পাত দিয়ে তৈরী করা হচ্ছে এসব তাবিজ। প্রতিদিন তারা কয়েক হাজার তাবিজ তৈরী করেন। তাবিজ তৈরী করেই চলে তাদের জীবন-জীবিকা।
সুমন মিয়া নামে তাবিজ তৈরীর একজন শ্রমিক জানান, তাবিজ তৈরীর প্রথম কাজটাই আমি শুরু করি। আমি স্টীলের পাত কেটে তাবিজ কাটিং করে দিলে অন্যরা তা তৈরী করে। প্রতিদিন তিনি ৫-৭ হাজার তাবিজ কাটিং করতে পারেন। প্রতি হাজার কাটিং করলে ৯০ টাকা পান। প্রতিদিন তিনি ৫০০/৫৫০ টাকা রোজগার করতে পারেন।

জামাল মিয়া নামে আরেক শ্রমিক বলেন, তাবিজের জন্য স্টীলের পাত কাটিং করে দিলে তা সাইজ করে তা জ্বালাই করতে হয়। পরে তাবিজটি মেশিনের মাধ্যমে পরিষ্কার করা হয়। তিনি বলেন, তিনি প্রতিদিন কয়েক হাজার তাবিজ জ্বালাই করে পরিষ্কার করেন। প্রতি হাজার ছোট তাবিজ ৭০ টাকা ও বড় তাবিজ ২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। তাবিজ জ্বালাইয়ের টাকা দিয়েই চলে তার সংসার।
উপজেলার পত্তন ইউনিয়নের তেতুইয়া গ্রামের “মায়ের দোয়া” তাবিজ কারখানার কারিগর রাহিম জানান, আগে তাবিজের খুবই চাহিদা থাকলেও বর্তমানে চাহিদা অনেক কমছে। চাহিদা কম থাকায় প্রায় ৬ মাস কারখানা বন্ধ ছিলো। মাস দুয়েক আগে কারখানা আবার চালু করা হয়েছে। এই কারখানায় বর্তমানে ৫জন শ্রমিক কাজ করে। আগে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বিভিন্ন মাজার কেন্দ্রিক পাইকাররা আমাদের কারখানায় এসে তাবিজ নিয়ে যেতো। কিন্তু এখন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ফলে আগের মতো মানুষ আর তাবিজ ব্যবহার করে না। সে জন্য এই এলাকার ৫টা কারখানার মধ্যে ২টা কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের তাবিজের গায়ে আল্লাহু লেখা থাকে। তিন সাইজের চেপটা তাবিজ।
একই কারখানার মালিক মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঢাকা থেকে স্টীলের পাত কিনে এনে তা ডায়েসের মাধ্যমে কাটিং করে তার কারখানায় প্রায় ১০ ধরনের তাবিজ তৈরী করা হয়।
তিনি বলেন, আগের মতো তাবিজের চাহিদা নেই। কয়েক মাস কারখানা বন্ধ রেখে আবার কারখানা চালু করেছি। তিনি বলেন, তার কারখানায় তিনিসহ ৫জন কাজ করেন। আমাদের তাবিজের গায়ে আল্লাহু লেখা থাকে। তিনি বলেন, আমার এখানে কাজ করে শ্রমিকরা প্রতিদিন ৫০০/৬০০ টাকা রোজগার করেন।
তিনি বলেন, ছোট সাইজের এক হাজার তাবিজ ৭০০/৮০০ টাকা, মাজারি সাইজের এক হাজার তাবিজ ৯০০/১০০০ টাকা ও বড় সাইজের এক হাজার তাবিজ ১৩০০/১৫০০ টাকা করে পাইকারি বিক্রি করা হয়।
তিনি বলেন, তার কারখানার তাবিজ ঢাকার চক বাজারে পাইকারী বিক্রি করা হয়। এছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা তার বাড়ি থেকে তাবিজ কিনে নিয়ে যায়।
তাবিজের ব্যবহার নিয়ে কয়েকজনের সাথে কথা বললে অনেকেই তাবিজের পক্ষে আবার অনেকেই এর বিপক্ষে বলেছেন।
আধ্যাত্মিক জগতের বিশ্বাসীরা বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি অপশক্তিরোধে তাবিজের কোন বিকল্প নেই। তারা জানান, গ্রামের সহজ-সরল লোকজনই জিন-ভ‚ত, নজর লাগাসহ নানা ধরনের রোগ বালাই থেকে মুক্তির জন্য তাবিজের ব্যবহার করেন।
অন্যদিকে সচেতন মহলের দাবি মানুষ অজ্ঞতার কারনে তাবিজ ব্যবহার করেন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রসারে এক সময় তাবিজের ব্যবহার আর থাকবেনা।
বিজয়নগর উপজেলার ইছাপুরা গ্রামের ইদন মিয়া বলেন, কোন মানুষকে যদি জ্বীন-পেতœী বা অন্য কোনো অপশক্তি ভর করে তাহলে কিন্তু সেই ব্যক্তিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়না, ওই ব্যক্তিকে নিয়ে যাওয়া হয় কোন আলেম, খনকার বা পীর মশায়েখের কাছে। সেখানে গেলে ওই ব্যক্তিকে ঝাড়-ফুক, তাবিজ-কবজ বা পড়াপানি দেয়া হয়। সেখানে গেলেই কিন্তু তারা উপকার পান।
সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের শাখাইতি গ্রামের জালাল মিয়া বলেন, তিনি তাবিজ ব্যবহার করে উপকার পেয়েছেন। এখনো কোন অসুখ-বিসুখ হলে তিনি তাবিজ ব্যবহার করেন। তিনি তার গলায় থাকা তাবিজ দেখিয়ে বলেন, তার গলায় এখনো ২টি তাবিজ আছে।
তিনি বলেন, তাবিজ ব্যবহার করে উপকার পেয়েছি। এটা আমার আত্মতৃপ্তি। তিনি বলেন, যারা আধ্যাত্মিক সাধক তারা কিন্তু পবিত্র কোরআনের আলোকেই তাবিজ দিয়ে থাকেন। তিনি বলেন “ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি অপশক্তি বিনাশে তাবিজের কোনো বিকল্প নেই।
বিজয়নগর উপজেলার বাসিন্দা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি দীপক চৌধুরী বাপ্পী বলেন, মানুষ ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে তাবিজ ব্যবহার করেন। তবে তাবিজ ব্যবহার করলে মানুষের রোগ-বালাই ভালো হবে তা তিনি মনে করেন না। তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলের মানুষ অপেক্ষাকৃত সহজ-সরল হওয়ায় তারা তাবিজ ব্যবহার করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, প্রতিদিন হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে রোগীদেরকে অপারেশন করাতে গেলে অনেক রোগীর কোমর, গলায় এমনকি হাতে তাবিজ দেখি। আমরা তাদের শরীর থেকে তাবিজ খুলে পরে অপারেশন করি। তিনি বলেন, আধুনিক চিকিৎসার যুগেও মানুষ কুসংস্কার থেকে তাবিজ ব্যবহার করেন।
তাবিজ সম্পর্কে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের সাবেক আবাসিক চিকিৎসক ডাঃ রানা নুরুস্ শামস বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে তাবিজের কোন সম্পর্ক নেই। মানুষ কুসংস্কার ও অজ্ঞতার কারনে এবং সহজলভ্য ও ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকায় তাবিজ ব্যবহার করেন। তবে ব্যবহারকারীর পরিমান দিন দিন কমছে। তিনি বলেন, তাবিজের কোন কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত হয়নি। তিনি বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞান তাবিজকে বিশ্বাস করেনা। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্যে এগুলো বাঁধা।
তাবিজ ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বিজয়নগর উপজেলার হরষপুর বরচাল হাতিম শাহ (রঃ) মাজারের খাদেম মোঃ মুর্তুজ আলী বলেন,“ তাবিজের গুনের কোন শেষ নেই। মানুষ যখন জ্বীন-পরিসহ বিভিন্ন আধ্যাত্মিক সমস্যায় পড়েন তখন তাদেরকে আমরা তাবিজ দিয়ে চিকিৎসা করি। আল্লাহর রহমতে তাবিজ ব্যবহার করলে সেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তিনি বলেন, মানুষ তাবিজ ব্যবহার করে উপকার পায় বলে এখনো তাবিজের ব্যবহার কমেনি। মানুষ আমাদের কাছে তাবিজের জন্য আসেন। আমরা বিনে পয়সায় তাদের চিকিৎসা দিয়ে থাকি।
