ব্রাহ্মণবাড়িয়াজুড়ে উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছে মাদক কারবার। জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা বিজয়নগর, আখাউড়া ও কসবা দিয়ে প্রতিদিন ভারত থেকে বিভিন্ন ধরনের মাদক পাচার হয়ে দেশে প্রবেশ করছে। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জেলায় সক্রিয় রয়েছে পাঁচ শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী।

পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযানের পরও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না মাদক ব্যবসা। জেলা পুলিশের তথ্য বলছে, শুধু বিজয়নগর উপজেলার সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের একটি অংশেই রয়েছে অন্তত ৬১টি মাদক স্পট।

সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, বিদেশি মদ, এস্কাফ সিরাপসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য দেশে প্রবেশ করছে। পরে এসব মাদক সড়ক, রেল ও নৌপথে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতেও চলছে মাদক বিক্রি। স্থানীয়দের ভাষায়, মাদক কারবার এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী তিন উপজেলা বিজয়নগর, কসবা ও আখাউড়ায় সক্রিয় রয়েছে অন্তত তিন শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী। এর মধ্যে ৮১ জনের বিরুদ্ধে রয়েছে ৪ থেকে ২০টি পর্যন্ত মামলা। অনেকেই জামিনে বের হয়ে আবারও মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিজয়নগরের সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের কাশিনগর গ্রাম মাদক কারবারের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ওই এলাকায় জসিম উদ্দিন, সবুজ মিয়া, জহিরুল ইসলাম, আয়েশা বেগম, বাবু মিয়া, সজল মিয়া, মামুন মিয়া, ফারুক মিয়া, খোকন মিয়া ও কালু মিয়াসহ কয়েকজনকে স্থানীয়ভাবে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বিজয়নগরের উথারিয়াপাড়া এলাকার শাহ পরাণের বিরুদ্ধে রয়েছে অন্তত ২০টি মাদক মামলা। আখাউড়ার ছোট কুড়িপাইকা এলাকার জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে রয়েছে ১৮টি মামলা। এছাড়া বিজয়নগরের কালু মিয়া ও সজল মিয়ার বিরুদ্ধে রয়েছে ১২টি করে মামলা।

কসবা উপজেলার গঙ্গানগর মাইজহাটির স্বপন মিয়া, আকবপুরের জসিম মিয়া ও সবুজ মিয়া, লতুয়ামোড়ার শফিক, মন্দবাগের হানিফ, উত্তর চকবস্তার জুয়েল, গোবিন্দপুরের রনি ও কালিকাপুরের লোকমানের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে।

আখাউড়া উপজেলার নুরপুরের জাকির হোসেন, দুলাল মিয়া, দেবগ্রামের সোহাগ মোল্লা, বড় লৌহঘরের খলিল মিয়া, ছোট কুড়িপাইকার জয়নাল আবেদীন, সবুজ হোসেন, হীরাপুরের আব্দুল্লাহ, সুমন, কাপ্তান, জামাল, রাজাপুরের নাসির, ধলেশ্বরের কিবরিয়া, মোগড়ার বাবু ও আমোদাবাদের করিমের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছি। নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে অনেক মাদক কারবারি জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং মাদকবিরোধী সমাবেশও আয়োজন করা হচ্ছে। মাদকের ব্যাপারে কোনো আপস নয়।”

গত ৩০ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় নবাগত জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, “মাদক ব্যবসা একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এ বিষয়ে পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হবে।”

এর আগে, গত ২ মে বিজয়নগর উপজেলার ছতরপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত মাদকবিরোধী সমাবেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল বলেন, “মাদক শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি পরিবার, সমাজ ও পুরো প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়। মাদক ব্যবসায়ীরা মানবতার শত্রু। তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”

তিনি মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।