শেরপুর সীমান্তে সন্ধ্যা নামলেই বন থেকে হাতির দল লোকালয়ে এসে সাবাড় করছে ক্ষেতের পাকা, আধাপাকা ধান। হানা দিচ্ছে বাড়িঘর ও বাগানে। বন্যহাতির কবল থেকে ফসল রক্ষায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। অনেকেই কেটে ফেলছেন আধাপাকা ধান।

পাহাড়ি এলাকার কৃষকরা জানান, চলতি বোরো মৌসুমে প্রতিনিয়তই ধানক্ষেতে নেমে আসছে বন্যহাতির পাল। গত দুই সপ্তাহ ধরে শতাধিক বন্যহাতি একাধিক দলে ভাগ হয়ে গারো পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকার ধানক্ষেতে হানা দিচ্ছে। পা দিয়ে মাড়িয়ে নষ্ট করছে ধানক্ষেত। এতে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সীমান্তবাসীগণ।

হাতি তাড়াতে কেরোসিন দিয়ে মশাল জ্বালিয়ে ও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয়রা। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা।ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার কৃষকরা।

এদিকে, বোরো ধান কাটার মৌসুম সামনেই। এই সময়ে দ্বিগুণ বেড়েছে বন্যহাতির তাণ্ডব। প্রায় প্রতিদিনই বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় খাবারের সন্ধানে গহিন অরণ্য থেকে ধানক্ষেতে পালবেঁধে নেমে আসছে হাতি! ফসল রক্ষায় ধানক্ষেতে টঙ ঘর বানিয়ে রাতদিন পাহারা দিচ্ছেন কৃষকেরা। ঘরে তোলার আগ মুহূর্তে বন্যহাতির অত্যাচার বেড়েছে দ্বিগুণ। কোনোভাবেই ক্ষুধার্ত হাতিগুলোকে দমানো যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে এলাকার কৃষকরা ইতোমধ্যে আধাপাকা ধান কাটতে শুরু করেছেন।

ঝিনাইগাতী উপজেলার গান্ধিগাঁও এলাকার কৃষক মোস্তফা কামাল বলেছেন, ‘আমি ধারদেনা করে অনেক কষ্টে ইরিধান চাষ করেছিলাম। হাতি আমার সব শেষ করে দিছে। সারা বছর কী খাব, আর ধারদেনাই পরিশোধ করব কীভাবে?’

ষাটোর্ধ্ব কৃষাণী মতিজান বিবি বললেন, ‘স্বামী নাই, পোলাডারে (ছেলে) নিয়ে থাহি (থাকি)। কত কষ্ট কইরা আবাদ করলাম। হাতি তো সব শেষ কইরা দিলো। এহন আমগোর (আমাদের) কী অইবো। সরকার একটা ব্যবস্থা করুক। হাতি হাতির জাগায় থাহুক। আমরা আমগোর জাগায় থাহি।’ গোমড়া গ্রামের কৃষক আনোয়ারের বক্তব্য হাতি তাড়াতে মশাল জ্বালানোর জন্য সরকারিভাবে ডিজেলও দেওয়া হচ্ছে না। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।

নালিতাবাড়ী উপজেলার আন্ধারুপাড়া গ্রামের গারো উপজাতীয় কৃষক মেজেস সাংমা বলেন, ‘ফসল বাঁচাতে আমরা খেতের পাশে টঙ ঘর বানিয়ে রাতদিন পাহারা দেই। আমরা চিৎকার, হৈ-চৈ করে, টিন পিটিয়ে শব্দ করে আবার কখনো মশাল জ্বালিয়ে থাকি। কিন্তু বর্তমানে কেরোসিন তেলের সরবরাহ কম থাকায় ও দাম বেশি হওয়ায় হাতি তাড়াতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি জানান, বনবিভাগ থেকে ফসলের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও তা সবাই পায় না। বিশেষ করে জমির কাগজপত্রের কারণে বর্গাচাষিরা ক্ষতিপূরণ পান না। তাছাড়া ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় ক্ষতিপূরণ কম পাওয়া যায়।দাওধারা গ্রামের কৃষক মো. হালিম উদ্দিন অভিযোগ করেন, বন্যহাতি যা ক্ষতি করে সরকার তার চারভাগের একভাগও ক্ষতিপূরণ দেয় না। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি আরও সহজ করা দরকার।

এছাড়া হাতি আক্রান্ত এলাকায় উচ্চশক্তিসম্পন্ন আলো জ্বালানোর দাবিও জানান তিনি।পরিবেশবাদী সংগঠন শাইন-এর নির্বাহী পরিচালক সাংবাদিক মুগনিউর রহমান মনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘আমরা অনেক আগে থেকেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি করে আসছি। শুধু আশ্বাসই দেওয়া হয়, বাস্তবায়ন করা হয় না।’

ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল-আমিন ইনকিলাবকে জানান, গারো পাহাড়ে হাতির পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও হতাহতদের সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। একইসাথে বন্যহাতি ও মানুষের মাঝে সহাবস্থানের জন্য আমরা এলাকার মানুষকে সচেতন করছি। কৃষক যাতে সহজে তাদের ক্ষতিপূরণ পায় সে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে।’

শেরপুর-৩ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেল দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, ‘সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয়ভাবে যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা সাময়িক। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বনমন্ত্রীর নিকট বিষয়টি মহান জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছি। বিষয়টি নিয়ে প্রতিনিয়তই সংসদে কথা বলেই যাচ্ছি। আশা করছি দ্রুত সময়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সরকার। তিনটি উপায় নিয়ে আমরা সামনে এগোতে চাই—অভয়ারণ্য, হাতির খাদ্য ও পানির স্থায়ী ব্যবস্থা এবং সোলার ফেন্সিং বা সৌর বেড়ার ব্যবস্থা করা।’

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বন্যহাতির আক্রমণে কেউ নিহত হলে ৩ লাখ, আহত হলে ১ লাখ ও ফসলের ক্ষতির জন্য ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে সরকার। এদিকে বনাঞ্চলের কৃষকদের জমির কাগজপত্রের অভাবে তারা সরকারি ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না!

প্রসঙ্গত, ভারতের সীমান্তঘেঁষা জেলা শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিস্তীর্ণ গারো পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ৩০ বছর আগে থেকেই চলছে হাতির এই উপদ্রব। প্রতি বছর ফসলের মৌসুমে লোকালয়ে নেমে এসে হানা দেয় বন্যহাতির পাল। বিভিন্ন সময়ে হাতি তাড়াতে গিয়ে কৃষক মারা গেছেন, আবার মৃত্যু হয়েছে হাতিরও। কিন্তু বন বিভাগের পক্ষ থেকে দফায় দফায় বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে হাতি তাড়াতে ব্যবস্থা নেওয়ার নামে বিপুল পরিমাণ টাকা বরাদ্দ করে বন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে দায়সারা গোছের কাজ করা হয়েছে; প্রকল্পগুলো কোনো কাজেই আসেনি এবং কৃষকরা পায়নি কোনো প্রতিকার। ফলে গত ত্রিশ বছর ধরে চলছে হাতি-মানুষের যুদ্ধ। বেঘোরে মারা যাচ্ছেন কৃষক, কিছু হাতিরও মৃত্যু ঘটেছে।