যে বাবার হাত ধরে জীবনের পথচলা, যে মানুষটি সন্তানের ভালো ফলের অপেক্ষায় থাকতেন অধীর আগ্রহে, সেই বাবাই নেই আজ। এইচএসসি পরীক্ষার মাত্র কয়েক দিন আগে বাবাকে হারায় লিজা আক্তার। শোকের ভারে থমকে গিয়েছিল চারপাশ, এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল স্বপ্ন আর প্রস্তুতি। তবু বাবার স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে চোখের জল মুছে পরীক্ষার হলে বসেছিল সে। শনিবার প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে সেই লিজাই পেয়েছে জিপিএ-৫। জীবনের এই আনন্দের দিনে সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে পাশে না পাওয়ার বেদনা অবশ্য তার সব আনন্দকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।

লিজা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া এলাকার ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। বাবার মৃত্যুর শোক সামলে তার এমন সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ।

লিজার বাড়ি আখাউড়া পৌর এলাকার মসজিদপাড়া এলাকায়। তার বাবা মৃত রেজাউল ইসলাম (ছায়েদ)। মা রোজিনা আক্তার গৃহিণী। দুই ভাইয়ের মধ্যে লিজা বড়। এর আগে এসএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ পেয়েছিল সে। পড়াশোনায় শুরু থেকেই মেধাবী লিজার সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণা ও যত্ন ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি।

কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষার কয়েক দিন আগে বাবার মৃত্যুতে সেই চেনা জীবন হঠাৎ বদলে যায়। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে লিজা। বই খুললেই মনে পড়ত বাবার কথা। পড়ায় মন বসত না। এমন পরিস্থিতিতে স্বজনদের সাহস ও পরামর্শে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। বাবার স্বপ্ন পূরণের তাগিদেই নিজেকে সামলে নেয়। বুকের ভেতর জমে থাকা শোক নিয়েই একে একে শেষ করে পরীক্ষাগুলো।

ফল প্রকাশের পর জিপিএ-৫ পাওয়ার খবর শুনে আনন্দিত হয়েছেন স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসী। তবে এই আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে এক গভীর অপূর্ণতা। লিজার বিশ্বাস, বাবা বেঁচে থাকলে তার এই ফলাফলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। হয়তো সবার আগে মেয়েকে বুকে টেনে নিতেন। অথচ আজ সেই মানুষটিই নেই।

নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে লিজা বলেন, ‘বাবা সব সময় চাইতেন আমার ফল ভালো হোক। পরীক্ষার আগে বাবাকে হারানো ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত। বাবার স্বপ্ন পূরণের কথা ভেবেই নিজেকে সামলে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। বাবার মৃত্যুর পর কোনো কিছুই ভালো লাগত না। বারবার বাবার মুখ মনে পড়ত, পড়াশোনায় মন বসত না। বাবা বেঁচে থাকলে আমার এই ফল দেখে অনেক খুশি হতেন। সবার কাছে বাবার জন্য দোয়া চাই।’

আখাউড়া নাছরীন নবী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক খোরশেদ আলম জানান, আখাউড়া ক্যামব্রিয়ান কলেজ এর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পুরো আখাউড়া উপজেলায় একমাত্র জিপিএ-৫ পেয়েছে আমাদের শিক্ষার্থী লিজা। পরীক্ষা শুরুর অল্প কিছুদিন আগে তার বাবা মারা যান। তারপরও সে ভেঙ্গে পড়েনি। সে তার বিশেষত্ব ধরে রেখেছে। সে এখন ঢাকায় রেটিনাতে কোচিং করছে। সেখানে তার মন টিকতে চায় না। সময়ে অসময়ে ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করে। তাকে মোটিভেট করার চেষ্টা করা হয়। 

ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুর রাজ্জাক হাজারী বলেন, ‘লিজা শুরু থেকেই মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। তার ভালো ফলের ব্যাপারে শিক্ষকদের প্রত্যাশা ছিল। তবে পরীক্ষার কিছুদিন আগে বাবার মৃত্যুতে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এ সময় কলেজের শিক্ষকরা তাকে সাহস জুগিয়েছেন এবং সার্বিক সহযোগিতা করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাবাকে হারানোর মতো বড় শোক সামলে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তার এ সাফল্যে কলেজের সবাই আনন্দিত। আশা করি, ভবিষ্যতেও সে সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখবে।’

লিজার হাতে আজ জিপিএ-৫-এর সাফল্য, সামনে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু এই অর্জনের গল্পে যে মানুষটির সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হওয়ার কথা ছিল, তিনি নেই। তাই ফলাফলের আনন্দের মাঝেও লিজার কাছে সবচেয়ে বড় হয়ে আছে বাবার শূন্যতা।