মৃত্যুর পরও যেন মানুষের কল্যাণে কাজে লাগে তাঁর দেহ—এমন প্রত্যয় থেকেই নিজের মরদেহ শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে দান করে গেছেন নবীগঞ্জের লিটন দাশ তালুকদার। দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতায় চিকিৎসাধীন থাকার পর রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টার দিকে নবীগঞ্জ পৌরসভার শিবপাশায় নিজ বাসভবনে তিনি মারা যান। তাঁর বয়স ও পেশা সম্পর্কে প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
লিটন দাশ ছাত্রজীবনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন বলে পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীরা জানান। মৃত্যুর পর তাঁর দেহ চিকিৎসাশিক্ষা ও গবেষণায় ব্যবহারের বিষয়ে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মৃত্যুর বিষয়টি আঁচ করতে পেরে গত ১৩ আগস্ট লিটন দাশ নোটারীকৃত একটি ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে তাঁর মরদেহ হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহারের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ওই ঘোষণাপত্রটি কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরও করা হয়।
রোববার সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মরদেহ হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ। কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জাবেদ জিল্লুল বারী, এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুপার্থ ভট্টাচার্য, প্রধান মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব, হিসাবরক্ষক সূর্য লাল রায় ও ক্যাশিয়ার নারায়ণ পালসহ সংশ্লিষ্টরা এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। জেলা প্রশাসনের অনুমতিসহ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে রাত সাড়ে ৮টার দিকে লিটন দাশের বড় ভাই দিপু চন্দ্র দাশ তালুকদার ও স্বজনরা মরদেহটি হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন।
এ সময় কলেজের পক্ষ থেকে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে নবীগঞ্জে উপস্থিত ছিলেন এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুপার্থ ভট্টাচার্য, প্রধান টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব, হিসাবরক্ষক সূর্য লাল রায় ও ক্যাশিয়ার নারায়ণ পাল।
মরদেহ হস্তান্তরের আগে লিটন দাশের কর্ম ও স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানায় বাসদ হবিগঞ্জ জেলা ও নবীগঞ্জ উপজেলা শাখা। এ সময় ‘লাল সালাম’ প্রদর্শন করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদনে উপস্থিত ছিলেন বাসদ নবীগঞ্জ উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক চৌধুরী ফয়সল সুয়েব, বাসদ হবিগঞ্জ জেলা কমিটির সদস্য সচিব শফিকুল ইসলাম, উপজেলা কমিটির সদস্য কাঞ্চন চক্রবর্তী, লিটনের বড় ভাই দিপু চন্দ্র দাশ তালুকদার, তমাল ভট্টাচার্য, নরেন্দ্র পাল, কুমারেশ চক্রবর্তী, কংকন চক্রবর্তী ও জয় চক্রবর্তীসহ অন্যরা।
এ সময় বক্তারা বলেন, মৃত্যুর পর দেহ ও অঙ্গদান মানবকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। লিটন দাশের সিদ্ধান্ত সমাজে মানবিক ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার বিকাশে অনুপ্রেরণা জোগাবে বলেও তারা মন্তব্য করেন।
হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের প্রধান টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব বলেন, “আমাদের দেহ পচনশীল, কর্মটাই মূল। লিটন দাশ সেই মূল কাজটিই করে গেছেন। এ কারণে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ পরিবার আজীবন তাঁর মানবিক অবদানের কথা স্মরণ রাখবে।”
পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হবিগঞ্জ জেলার কোনো ব্যক্তির মরণোত্তর দেহদানের এমন ঘটনা এটিই প্রথম এবং হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজেও এটি প্রথম মরণোত্তর দেহ গ্রহণের ঘটনা। এ দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিতকরণ এই প্রতিবেদনে সম্ভব হয়নি।