চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অস্ত্রোপচারের পর সোহাগী খাতুন (১৪) নামে এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় জীবননগরের মনোয়ারা সনো সেন্টার অ্যান্ড নার্সিং হোমের চিকিৎসা নিয়ে অভিযোগ তুলেছে নিহতের পরিবার।

সোহাগী জীবননগর উপজেলার হাসাদাহ ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের মোমিনুর রহমান মণ্ডলের মেয়ে। সে স্থানীয় বিসিকেএমপি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৭ আগস্ট অসুস্থ অবস্থায় সোহাগীকে মনোয়ারা সনো সেন্টার অ্যান্ড নার্সিং হোমে নেওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। পরদিন ২৮ আগস্ট তার অস্ত্রোপচার করা হয়। ৩০ আগস্ট তাকে বাড়িতে নেওয়া হয়।

স্বজনেরা জানান, বাড়ি ফেরার পর সোহাগীর প্রচণ্ড বমি, মাথাব্যথা ও জ্বর শুরু হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ২ সেপ্টেম্বর তাকে আবার ওই ক্লিনিকে নেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, সেখানে চিকিৎসা নিয়ে টানাপোড়েনের পর তার অবস্থার আরও অবনতি হয়।

সোহাগীর মা লাভলী খাতুনের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর থেকেই মেয়ের শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে প্রথমে যশোরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ঢাকায় নেওয়ার পর সোহাগীকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

সোহাগীর খালা নাসিমা খাতুনের দাবি, ঢাকার চিকিৎসকেরা আগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন দেখে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন ছিল কি না এবং চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি হয়েছিল কি না—তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ হওয়ার বিষয়।

নিহতের বাবা মোমিনুর রহমান মণ্ডল চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, ডা. রফিকুল ইসলাম ঢাকায় থাকেন এবং সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে জীবননগরে এসে চেম্বার ও অস্ত্রোপচার করেন। তার প্রতিষ্ঠানে এর আগেও চিকিৎসা নিয়ে অভিযোগের ঘটনা ঘটেছে বলে তারা দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে মনোয়ারা সনো সেন্টার অ্যান্ড নার্সিং হোমের মালিক ও চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়াউদ্দীন আহমেদ জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ক্লিনিকে গিয়ে সোহাগীর চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনা করবে এবং ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চিকিৎসায় অবহেলা বা ভুল চিকিৎসা হয়েছিল কি না, অস্ত্রোপচারের যথার্থতা এবং পরবর্তী চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম ছিল কি না—তদন্ত প্রতিবেদনেই এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার কথা। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দায়ী হিসেবে চিহ্নিত না করে সংশ্লিষ্ট নথি, চিকিৎসা প্রতিবেদন ও চিকিৎসা-প্রক্রিয়া যাচাই করাই হবে ঘটনার নিরপেক্ষ সত্য উদ্‌ঘাটনের প্রধান ভিত্তি।