একটি স্কুলে শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা শ্রেণিকক্ষে। কিন্তু সেই স্কুলের ভেতরেই স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাদ্যবাহী গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারাতে হলো ছয় বছরের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী আমির হামজাকে। ঘটনার পর শোক আর ক্ষোভে ফুঁসছে পুরো রামনগর। আর সেই ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা। দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে যাননি, জানাজায়ও ছিলেন না। এবার তদন্ত কমিটির সামনেও হাজির হননি তিনি। এ ঘটনায় দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অভিযোগ এনে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহত শিশুর বাবা এবং স্থানীয়রা।

সোমবার (৩ আগস্ট) জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের গঠিত তদন্ত কমিটি গাংনী উপজেলার রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন সদর, গাংনী ও মুজিবনগর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তদন্ত চলাকালে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমানউল্লাহকে উপস্থিত হতে বলা হলেও তিনি আসেননি। পরে তদন্ত কমিটি নিহত শিক্ষার্থী আমির হামজার বাড়িতে গেলে সেখান থেকেও তাকে ফোন করে ডাকা হয়। কিন্তু তিনি ঘটনাস্থলে যেতে অস্বীকৃতি জানান বলে জানা গেছে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, বিদ্যালয়টিতে পাঁচজন শিক্ষক উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও সোমবার উপস্থিত ছিলেন মাত্র তিনজন। একজন শিক্ষক দাপ্তরিক কাজে বাইরে ছিলেন। অপর দুইজন কোনো ধরনের ছুটির আবেদন ছাড়াই অনুপস্থিত ছিলেন। আর প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে না থেকে বাইরে একটি চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়ার আগ পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক ঘটনাস্থলে যাননি। এমনকি আমির হামজার জানাজায়ও তিনি অংশ নেননি।

তদন্ত চলাকালে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে আরও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া যায়। তাদের দাবি, বিদ্যালয়ের ভেতরের পরিবেশ নিরাপদ নয়। স্কুল প্রাঙ্গণেই বহিরাগতদের আড্ডার জন্য স্থায়ী মাচা ও বসার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে নিয়মিত মাদকসেবীদেরও আনাগোনা দেখা যায়। অথচ এসব বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর নজরদারি বা উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

নিহত শিক্ষার্থী আমির হামজার বাবা আব্দুল হাকিম বলেন, ‘যে বিদ্যালয়ে এমন একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আমার সন্তানের মৃত্যু হলো, সেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি হাসপাতালে যাননি, জানাজায়ও আসেননি। এখন আমি গাংনী থানায় গিয়ে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’

শিশুটির মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে যে সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে, সে সময় তো তার শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা ছিল। শিক্ষকরা যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে হয়তো আমার ছেলেটা আজ বেঁচে থাকত।’

স্থানীয় বাসিন্দা শিপলু বলেন, ‘কিছুদিন আগেও এই বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর হাত ভেঙে যায়। অথচ স্কুলের কেউ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। এবার একজন ছাত্র জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিল, সেখানেও শিক্ষকদের উপস্থিতির প্রয়োজন মনে হয়নি। তাহলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা কতটা দায়িত্বশীল, সেটাই প্রশ্ন।’

বামন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রাশিদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, ‘দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমি দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে উত্তেজিত মানুষকে শান্ত করার চেষ্টা করি। আজ তদন্তের সময়ও উপস্থিত ছিলাম। নিহতের পরিবারকে সান্তনা দিয়েছি। তবে প্রধান শিক্ষক আমানউল্লাহ যে দায়িত্বহীন আচরণ করেছেন, তা আর আড়াল করার সুযোগ নেই। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তাকে তদন্তে উপস্থিত হতে বললেও তিনি আসেননি।’

এর আগে, রোববার (২ আগস্ট) দুপুরে রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাদ্যসামগ্রী বহনকারী একটি স্যালো ইঞ্জিনচালিত গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আমির হামজার মৃত্যু হয়। সে রামনগর গ্রামের বাজারপাড়ার আব্দুল হাকিমের ছেলে।

ঘটনার পর বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে উপস্থিত ছিলেন গাংনী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ, সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম জয়নুল ইসলাম, মো. আলাউদ্দিন, মুজিবনগর সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামসুজ্জোহা, বামন্দী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শাহ আলম, রামনগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আরিফুল ইসলাম এবং বামন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রাশিদুল ইসলাম সোহাগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গাংনী থানার ওসি মুহাদ্দিদ মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘শিশু আমির হামজার বাবা আজকে গাংনী থানায় সড়ক পরিবহন আইনে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে। মামলা দায়েরর পূর্বে বাদি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে মামলার আসামি করবেন বলে জানালেও পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।’