একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, ১১টি প্রাণহানি এবং ধ্বংসস্তূপে নিখোঁজ এক শিক্ষিকাকে ঘিরে দশ দিনের রহস্যাবৃত অপেক্ষা—টুপটুপ রিসোর্ট ট্র্যাজেডি ক্রমেই জন্ম দিচ্ছে বহুমাত্রিক প্রশ্নের। আগুনের বিভীষিকা থেমে গেলেও স্বজনদের দশ দিনের উৎকণ্ঠা থামেনি প্রতিটি দিন অতিবাহিত হয়েছে অনিশ্চয়তা ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে। তবে স্বস্তি নয়, নিখোঁজ স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তার মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে স্বজনদের জীবনে নেমে এসেছে আরও গভীর শোক।
মঙ্গলবার সকালে অবশেষে রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয় নাসরিন আক্তার মুক্তার মরদেহ।গলার লকেট দেখে পরিচয় নিশ্চিত করেন তাঁর স্বামী ফয়সাল দেওয়ান, যিনি স্ত্রীকে খুঁজতে দশ দিন ধরে কক্সবাজার ও ঢাকায় ছুটেছেন। দীর্ঘ বিলম্বে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশাসনিক তৎপরতা ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তবে এই বিলম্বের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে প্রয়োজন উদ্ধার অভিযানের নথি, তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা এখন জরুরী হয়ে উঠেছে। অনেকের প্রশ্ন এত বড় অগ্নিকাণ্ডের পরও কি ধ্বংসস্তূপে যথাযথভাবে তল্লাশি চালানো হয়েছিল।
কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের নিরাপত্তাব্যবস্থা, রিসোর্ট পরিচালনায় দায়িত্বশীলতা এবং দুর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে সামনে এসেছে গুরুতর প্রশ্ন। আগুনে ১০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পরও একজন মানুষ নিখোঁজ রয়ে গেলেন কীভাবে, কেন তাঁর মরদেহ উদ্ধারে দশ দিন অপেক্ষা করতে হলো এসব নানানমুখী প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্পষ্ট জবাব দাবি করছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, গতসোমবার রাতে অনানুষ্ঠানিকভাবে ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলে একজনের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ার বিষয়টি জানা যায়। এরপর মঙ্গলবার সকালে নতুন করে তল্লাশি শুরু করা হয়। আগেও ঘটনাস্থলে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল। তবে আগুনের প্রচণ্ড তাপে ধ্বংসস্তূপের একটি অংশে থাকা মরদেহটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
ওসি আরও জানান, ১০ দিন পেরিয়ে যাওয়ায় উদ্ধার করা মরদেহটি অনেকটা কঙ্কাল সদৃশ হয়ে পড়েছিল। পরে গলার লকেট দেখে ফয়সাল দেওয়ান সেটি তাঁর স্ত্রীর মরদেহ হিসেবে শনাক্ত করেন।
এ নিয়ে ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হলো। এদের মধ্যে সাতজন নারী, দুজন পুরুষ ও দুটি শিশু রয়েছে। নিহতদের মধ্যে তিনজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল না, তবু নিখোঁজ ছিলেন মুক্তা। অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধার করা প্রথম ১০টি মরদেহের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার আশ্রয় নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সিআইডির পরীক্ষাগারে মরদেহের নমুনার সঙ্গে স্বজনদের সংগৃহীত নমুনা মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু নিখোঁজ মুক্তার বাবার ডিএনএ নমুনার সঙ্গে ওই ১০টি মরদেহের কোনো নমুনার মিল পাওয়া যায়নি।
মুক্তার পরিচয় শনাক্তের জন্য তাঁর বাবা মো: মোস্তফা কামালও ডিএনএ নমুনা দিয়েছিলেন। এব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিমন ঘোষ জানান, ১১ জনের পরিচয় শনাক্তের জন্য ডিএনএ নমুনা পাওয়া গিয়েছিল। পরীক্ষায় মর্গে থাকা প্রথম ১০টি মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত হলেও মুক্তার বাবার নমুনার সঙ্গে সেগুলোর কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
তিনি আরো ভরেন, এরপরও মুক্তার সন্ধান না মেলায় স্বজনদের অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হয়। একদিকে ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল, অন্যদিকে ঘটনাস্থলে তল্লাশি সবকিছুর মধ্যে অনিশ্চয়তার ভার বহন করতে হয়েছে পরিবারটিকে। অবশেষে ধ্বংসস্তূপ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে নিখোঁজ থাকার অবসান ঘটল।
এদিকে,স্বামীর ১০ দিনের ছোটাছুটি শেষে লকেটেই পরিচয় মিলেছে নাসরিন আক্তার মুক্তা ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারের আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষিকার। দুই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজার ভ্রমণে এসে তিনি উঠেছিলেন শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে ইনানীর পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে। গত ১৭ অক্টোবর সকালে রিসোর্টটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনের সময় মুক্তার দুই বান্ধবী সমুদ্রসৈকতে হাঁটতে বের হয়েছিলেন। মুক্তা তখন রিসোর্টের কক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন বলে জানা গেছে। বাইরে থাকায় তাঁর দুই বান্ধবী প্রাণে বেঁচে গেলেও আগুনের কবল থেকে আর বের হতে পারেননি মুক্তা।
স্ত্রীর খোঁজে ১০ দিন ধরে কক্সবাজার ও ঢাকায় ছোটাছুটি করেছেন ফয়সাল দেওয়ান। মরদেহ শনাক্ত হওয়ার পর তাঁর কণ্ঠে ছিল হারানোর অসহনীয় বেদনা। ফয়সাল দেওয়ান বলেন, আমি খুব অসহায় ক্লান্ত, দশ দিন পর লাশ পেলে তার কী অবস্থা থাকে, নিজেরা অনুভব করেন। যেভাবেই হোক, আমার স্ত্রীর বডিটি চেয়েছিলাম। আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলে প্রার্থনা করেছি, আমার স্ত্রী মৃত হলে্ও যেন বডিটার খোজ পায়।
১১ প্রাণহানি, দুই পরিবারের শোক। একটি পরিবারের চারজন এবং অন্য পরিবারের ছয়জনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। চার সদস্যের পরিবারটি হলো শ্যামলীতে অবস্থিত গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬)।
অন্য পরিবারের সদস্যরা হলেন মৌলিতা মেহজাবিন আলভি (১৯), তাঁর কাজিন লায়লা জাহান নাবিলা (২৫) ও ইসরাত জাহান মালিহা (২৭), ফারিয়া কবির (৩৩), তাঁর ছয় বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূর এবং ফারিয়ার ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামি (২৪)।
নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নাহিদুর রহমান ও তাঁর দুই মেয়ের পরিচয় শনাক্তে তাঁর বাবা মো. মতিয়ার রহমান এবং আফসানা মতিনের পরিচয় শনাক্তে তাঁর বাবা আবদুল মতিন ও মা রেহানা আফরোজ নমুনা দেন।
মৌলিতা মেহজাবিন আলভির জন্য তাঁর বাবা মো. সেলিম, লায়লা জাহান নাবিলা ও ইসরাত জাহান মালিহার জন্য তাঁদের বাবা মো. মামুনউর রশীদ, ফারিয়া কবিরের জন্য তাঁর বাবা মো. জেয়াদুল কবির, ফারিয়ার ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূরের জন্য তাঁর বাবা মো. নুর আলম এবং নাফিস তেহামির জন্য তাঁর বাবা মো. জেয়াদুল কবির ডিএনএ নমুনা দেন।
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে প্রথম ১১টি মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ও পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান।
মুক্তার মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে তাঁর স্বজনদের দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটেছে। কিন্তু এই মৃত্যু ঘিরে যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোর নিষ্পত্তি এখনো বাকি। একটি পর্যটনকেন্দ্রে বেড়াতে এসে ১১ জন মানুষের প্রাণহানি কোনোভাবেই কেবল একটি দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
