জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক হাজার ৫০০ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭ হাজার ৫০০ গাছের চারা বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস বাংলাদেশ। প্রত্যেককে পাঁচটি করে চারা দেওয়ার পাশাপাশি গাছের পরিচর্যা পর্যবেক্ষণে কিউআর কোডযুক্ত পরিচয়পত্র এবং ভালো পরিচর্যাকারীদের পুরস্কৃত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার পাঁড়ইল ইউনিয়নের ঝাড়ুয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত চারা বিতরণ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) আর্থিক সহযোগিতায় ‘এক্সটেন্ডেড কমিউনিটি ক্লাইমেট চেঞ্জ প্রজেক্ট-ড্রট (ইসিসিসিপি-ড্রট)’ প্রকল্পের আওতায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে আরডিআরএস বাংলাদেশ।

সংস্থাটি জানিয়েছে, উপজেলার রসুলপুর, পাঁড়ইল, শ্রীমন্তপুর ও বাহাদুরপুর ইউনিয়নের আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। প্রত্যেককে নিম, কৃষ্ণচূড়া, মিষ্টি আমড়া, কাঁঠাল ও জলপাই প্রজাতির একটি করে মোট পাঁচটি চারা দেওয়া হচ্ছে। এসব চারা রোপণের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যা ও সুরক্ষার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ঝাড়ুয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুল আলমের সভাপতিত্বে এবং সহকারী শিক্ষক খাইরুল হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঝাড়ুয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হেদায়েতুল্লাহ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন ঝাড়ুয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মরিয়ম জান্নাত নূর এবং পবিত্র গীতা পাঠ করেন মিলি নুন্নাহার।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ঝাড়ুয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আলেফ হোসেন, সহকারী শিক্ষক আব্দুস সালাম ও আরডিআরএস বাংলাদেশের ইসিসিসিপি-ড্রট প্রকল্পের নিয়ামতপুর, নওগাঁর প্রকল্প সমন্বয়কারী রাকিব উদ্দিন।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন আরডিআরএস বাংলাদেশের অ্যাকাউন্টস কাম এমআইএস অফিসার শামীমুর রহমান, সিএমও (সিভিল) হাবিব-উন-নবী নিরব, সিএমও (জেনারেল) আলামিন ইসলামসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হেদায়েতুল্লাহ বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বরেন্দ্র অঞ্চলে ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। তীব্র খরা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এ সংকট মোকাবিলায় নতুন প্রজন্মকে এখন থেকেই পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতন হতে হবে। প্রত্যেকে অন্তত পাঁচটি করে গাছ রোপণ ও পরিচর্যা করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’

তিনি আরও বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব অপরিসীম। শুধু গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং প্রতিটি গাছকে বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই বৃক্ষরোপণের অভ্যাস গড়ে উঠলে তারা ভবিষ্যতে পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

প্রকল্প সমন্বয়কারী রাকিব উদ্দিন জানান, গত ২৭ ও ২৮ অক্টোবর দুই দিনে চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৪৮ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে দুই হাজার ৭৪০টি চারা বিতরণ করা হয়েছে।

এর মধ্যে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ধানসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২০০ জনকে এক হাজার এবং মুক্তারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৮০ জনকে ৪০০টি চারা দেওয়া হয়। বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঝাড়ুয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১০০ জনকে ৫০০টি এবং ঝাড়ুয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৬৮ জনকে ৮৪০টি চারা বিতরণ করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, পর্যায়ক্রমে চারটি ইউনিয়নের আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক হাজার ৫০০ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে মোট সাত হাজার ৫০০টি চারা বিতরণ করা হবে। ইতোমধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠানে বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট চারটি প্রতিষ্ঠানের ৯৫২ জনের মধ্যে চার হাজার ৭৬০টি চারা বিতরণ করা হবে।

শুধু চারা বিতরণ নয়, সেগুলো বাঁচিয়ে রাখা এবং নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করতেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি গাছ সুরক্ষায় বেড়া দেওয়ার জন্য নেট সরবরাহ করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের গাছের নাম ও অবস্থা-সংক্রান্ত তথ্যসংবলিত কিউআর কোডযুক্ত পরিচয়পত্র দেওয়া হবে।

প্রকল্প সমন্বয়কারী বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যাতে চারা রোপণের পর নিয়মিত পরিচর্যা করে, সে জন্য পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যারা ভালোভাবে গাছের পরিচর্যা করতে পারবে, তাদের মধ্য থেকে প্রতি শ্রেণিতে তিনজনকে সেরা গার্ডেনার হিসেবে পুরস্কৃত করা হবে।’

তিনি জানান, চারা বিতরণের পর সেগুলোর পরিচর্যা ও বেড়ে ওঠার বিষয়টি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিউআর কোডযুক্ত পরিচয়পত্রের মাধ্যমে গাছের তথ্য সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাছের প্রতি যত্নশীল হওয়ার প্রবণতা বাড়বে বলে আশা করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।

রাকিব উদ্দিন আরও জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে কৃষি ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ, খরাসহিষ্ণু কৃষি ও জৈব সার উৎপাদনে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

প্রকল্পের আওতায় পরিত্যক্ত খাল ও পুকুর পুনঃখনন, বৃষ্টির পানি পরিশোধন করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে প্রবেশ করানোর জন্য ম্যানেজড অ্যাকুইফার রিচার্জ (এমএআর) কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে সহায়তা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া প্রান্তিক কৃষকদের খরাসহিষ্ণু ফল ও ফসল চাষে প্রশিক্ষণ ও এককালীন ঋণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি উৎপাদনে যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় কৃষকদের বিকল্প ও খরাসহিষ্ণু চাষাবাদ পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করানো হচ্ছে।

পুষ্টির ঘাটতি পূরণে গ্রামীণ নারীদের বসতবাড়িতে ফল ও সবজির বাগান স্থাপনে সহায়তা এবং মাটির উর্বরতা বাড়াতে রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে পরিবারভিত্তিক ভার্মি কম্পোস্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগও রয়েছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বসতবাড়িতে ফল ও সবজির বাগান স্থাপনের মাধ্যমে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি উৎপাদন থেকে আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন ও ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির জৈব উপাদান বৃদ্ধি এবং রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।

প্রকল্প সমন্বয়কারী জানান, কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (এডব্লিউডি) প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ধান চাষে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অন্য কৃষকদেরও এ পদ্ধতি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

এডব্লিউডি প্রযুক্তিতে ধানখেতে সব সময় পানি জমিয়ে না রেখে নির্দিষ্ট বিরতিতে সেচ দেওয়া হয়। জমির পানির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়ার মাধ্যমে পানির অপচয় কমানো সম্ভব। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল বরেন্দ্র অঞ্চলে এ প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা গেলে সেচের পানির ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও টেকসই করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প সমন্বয়কারী আরও জানান, এসব কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য এলাকাভিত্তিক গঠিত কমিউনিটি ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন গ্রুপের (সিসিএজি) সঙ্গে নিয়মিত মাসিক সমন্বয় সভা করা হয়। এসব সভায় স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অভিযোজন কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানান, সরকারের পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি, বৃক্ষরোপণের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

তাঁরা মনে করেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শুধু বৃক্ষরোপণই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার, মাটির উর্বরতা রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বৃদ্ধির মতো কার্যক্রম সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

আলোচনা সভা শেষে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের হাতে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা তুলে দেন অতিথিরা।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান খরা ও পানিসংকট মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ এবং জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের সরাসরি সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে।