ভোলার মনপুরা-তজুমুদ্দিন নৌরুটে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) একমাত্র নিরাপদ সি-ট্রাক গত ছয় মাস ধরে বন্ধ থাকায় প্রতিদিন শত শত যাত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পণ্যবাহী ট্রলারে মেঘনা নদী পারাপার করছেন। নিরাপত্তাহীন এ যাত্রায় নারী, শিশু, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও রোগীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও মেঘনার ডেঞ্জার জোনে সি-সার্ভে ছাড়া অবৈধ ট্রলারে যাত্রী পরিবহন চলছে দীর্ঘদিন ধরে। অথচ এসব নৌযান নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএর কার্যকর তদারকি নেই। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে মনপুরা ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, একটি পণ্যবাহী ট্রলারে শতাধিক যাত্রীকে গাদাগাদি করে তজুমুদ্দিনের উদ্দেশে যাত্রা করতে। ট্রলারটির ওপর ত্রিপল টানিয়ে যাত্রী বহন করা হলেও সেখানে নেই কোনো ফিটনেস সনদ, বৈধ যাত্রী পরিবহনের অনুমতি কিংবা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

একই দিন দুপুরে তজুমুদ্দিন ঘাট থেকে মনপুরাগামী ট্রলারেও নারী, শিশু ও বয়স্কসহ শতাধিক যাত্রীকে মালামালের সঙ্গে একই স্থানে যাত্রা করতে দেখা যায়। বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, নেই লাইফ জ্যাকেট বা অন্য কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম। প্রচণ্ড গরম, বৈরি আবহাওয়া ও উত্তাল নদীতে ঝুঁকি নিয়েই যাত্রা করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

যাত্রীদের অভিযোগ

কয়েক দিন আগে ওই ট্রলারে যাত্রী ছিলেন মনপুরা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির আমিমুল এহসান জসিম। তিনি বলেন,
“ট্রলারে বসার জায়গা পর্যন্ত ছিল না। দীর্ঘ সময় পল্টুনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। গত ছয় মাস ধরে মনপুরার মানুষ বাধ্য হয়ে এভাবেই চলাচল করছেন। আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি একাধিকবার উত্থাপন করেছি, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। মনপুরার মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত নতুন একটি সি-ট্রাক বরাদ্দ প্রয়োজন।”

হাজিরহাট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তপন চন্দ্র হাওলাদার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে মনপুরা যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘাটে এসে ট্রলারের অবস্থা দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন,
“উত্তাল নদী আর ট্রলারের অবস্থা দেখে উঠতেই ভয় লাগছে। কিন্তু বিকল্প নেই। মনপুরার প্রতিটি মানুষ প্রতিদিন জীবন হাতে নিয়েই চলাচল করছেন।”

উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা আলী আকবর বলেন,
“মালবাহী ট্রলারে মানুষ, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও পণ্য একসঙ্গে বহন করা হচ্ছে। বৃষ্টিতে ভিজতে হয়, গরমে অসহনীয় কষ্ট। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ বাধ্য হয়েই এ ঝুঁকি নিচ্ছে।”

এক কলেজ শিক্ষার্থী জানান, ট্রলারে যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য কোনো ধরনের সরঞ্জাম নেই। দুর্ঘটনা ঘটলে আত্মরক্ষারও সুযোগ থাকবে না।

সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষার অভিযোগ

স্থানীয় সূত্র জানায়, মনপুরা-তজুমুদ্দিন নৌরুটে নিরাপদ যাত্রী পরিবহনের জন্য ‘এসটি ইলিশা’ নামে বিআইডব্লিউটিসির একটি সি-ট্রাক চালু ছিল। কিন্তু গত বছরের নভেম্বর থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সেটি বন্ধ রয়েছে।

অন্যদিকে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি বছর ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত মেঘনার ডেঞ্জার জোনে সি-সার্ভে ছাড়া কোনো নৌযানে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ। কিন্তু সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে পণ্যবাহী ট্রলারে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

বিআইডব্লিউটিসির উপ-বাণিজ্য ব্যবস্থাপক (যাত্রী) খন্দকার মুহাম্মদ তানভী হোসেন বলেন,
“যান্ত্রিক ত্রুটি এবং ইজারা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সি-ট্রাকটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। সমস্যাগুলো প্রায় সমাধান হয়েছে। খুব শিগগিরই সি-ট্রাকটি পুনরায় চালু করা হবে।”

বিআইডব্লিউটিএর সহকারী পরিচালক নির্মল কুমার রায় বলেন,
“ডেঞ্জার জোনে সি-সার্ভে ছাড়া কোনো ট্রলারে যাত্রী পরিবহন আইনত নিষিদ্ধ। মনপুরা-তজুমুদ্দিন নৌরুটে অবৈধভাবে যাত্রী বহনকারী ট্রলারগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

স্থানীয়দের দাবি

মনপুরাবাসীর দাবি, একটি দ্বীপ উপজেলার মানুষের একমাত্র ভরসা নিরাপদ নৌযোগাযোগ। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে সি-ট্রাক বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে অবিলম্বে সি-ট্রাক চালু এবং অবৈধ যাত্রীবাহী ট্রলারের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।