নরসিংদীর অর্থকরী ফল লটকন এখন জেলার কৃষি অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় উৎপাদিত লটকন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি বিদেশেও বাজার পাচ্ছে। প্রতিবছর এই ফল বিক্রি করে হাজারো কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। তবে কৃষকদের মতে, চলতি মৌসুমে কিছু এলাকায় ফলন তুলনামূলক কম হলেও বাজারদর সন্তোষজনক রয়েছে।
জেলার শিবপুর, বেলাব, রায়পুরা ও পলাশ উপজেলার বিভিন্ন বাগানে এখন লটকন সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। বড় আকারের, হলুদ বর্ণের এবং মিষ্টি স্বাদের লটকনের জন্য নরসিংদীর বিশেষ সুনাম রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নরসিংদী জেলায় প্রায় ১ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে শিবপুর উপজেলায়, যেখানে প্রায় ১ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে লটকন চাষ করা হয়েছে। জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার লটকন বাগান রয়েছে এবং এ খাতের সঙ্গে প্রায় ১৫ হাজার কৃষক সরাসরি সম্পৃক্ত।

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার একটি লটকন বাগানে ফল সংগ্রহে ব্যস্ত শ্রমিকরা।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, নরসিংদীর লটকন ২০২৫ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি লাভ করে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) এ স্বীকৃতি প্রদান করে।
সরেজমিনে শিবপুরের বিভিন্ন বাগান ও বাজার ঘুরে দেখা যায়, চাষি ও ব্যবসায়ীরা বাগান থেকে সংগ্রহ করা তাজা লটকন বাজারে সরবরাহ করছেন। গুণগত মান ও আকারভেদে বর্তমানে প্রতি কেজি লটকন ৮০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, তুলনামূলক কম খরচ ও সহজ পরিচর্যায় ভালো লাভ হওয়ায় লটকন চাষ স্থানীয় কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সাধারণত চারা রোপণের চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে গাছে ফল আসতে শুরু করে এবং একটি বাগান থেকে ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা সম্ভব।
শিবপুর উপজেলার জয়নগর এলাকার লটকন চাষি জুলহাস ভূঁইয়া জানান, চলতি মৌসুমে তিনি তার বাগান ১৯ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী হযরত আলী বলেন, তিনি ৪২ লাখ টাকায় একটি লটকন বাগান কিনেছেন এবং সব খরচ বাদ দিয়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন।
আরেক ব্যবসায়ী ইকবাল হাসান জানান, তিনি এ মৌসুমে প্রায় ৫০ লাখ টাকার লটকন কিনেছেন। দুই মাস ধরে এসব ফল বাজারজাত করা হবে। এ কাজে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। তিনি প্রায় ২০ লাখ টাকা মুনাফার আশা করছেন।
শিবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহসিনা জাহান তোরণ বলেন, উপজেলার উঁচু ও লালচে অম্লীয় মাটি এবং উপযোগী আবহাওয়া লটকন চাষের জন্য অনুকূল। ভালো ফলন ও লাভজনক বাজারমূল্যের কারণে প্রতিবছর নতুন কৃষক এ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষি বিভাগ নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, নরসিংদীর বিভিন্ন উপজেলায় উৎপাদিত লটকনের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ এই ফল দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিতি পাচ্ছে। এর ফলে জেলার হাজারো কৃষক অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন।
