টাঙ্গাইল শহরের বিভিন্ন দেয়ালে আঁকা ব্যতিক্রমধর্মী চিত্রকর্মের কারণে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত মুখ আবু বক্কর সিদ্দিক (৫১)। শহরের অনেকেই তাকে ‘চাঁনু মিয়া’ নামে চেনেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কয়লা, কচুরিপানা ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করে দেয়ালে চিত্র অঙ্কন করে আসছেন। তার কাজ স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী ও সংস্কৃতিমনা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইল শহরের এনায়েতপুর এলাকার বাসিন্দা চাঁনু মিয়া পরিবারে পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। তিনি দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। শৈশবে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজের ফাঁকে মাটি, কয়লা ও বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে ছবি আঁকার অভ্যাস গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে পারিবারিক শোক ও ব্যক্তিগত সংকটের পর তিনি আরও বেশি সময় চিত্রকর্মে মনোনিবেশ করেন।
শহরের বিভিন্ন দেয়ালে তার আঁকা ছবিতে প্রায়ই দেখা যায় এক জোড়া তরুণ-তরুণীর প্রতিকৃতি। এছাড়া মসজিদ, প্রকৃতি, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অনুষঙ্গ এবং সামাজিক বার্তাধর্মী বিষয়ও স্থান পায় তার শিল্পকর্মে। অনেক দেয়ালে তিনি উপদেশমূলক বা সচেতনতামূলক কথাও লিখে রাখেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, একটি বস্তায় প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে তিনি শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকেন। পার্কবাজার এলাকার একটি দেয়ালে চিত্রকর্ম করার সময় উৎসুক মানুষকে তার কাজ পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি এঁকে ফেলতে সক্ষম হন।

স্থানীয় বাসিন্দা রাব্বি ইসলাম বলেন, “ছোটবেলা থেকেই তাকে শহরের বিভিন্ন দেয়ালে ছবি আঁকতে দেখছি। তার কাজ অনেকের আগ্রহের কারণ হয়ে উঠেছে।”
পার্কবাজার এলাকার ব্যবসায়ী মো. ইদ্রিস আলী বলেন, “চাঁনু মিয়া দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব কৌশলে ছবি আঁকছেন। প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পেলে তার প্রতিভা আরও বিকশিত হতে পারে।”
অটোরিকশাচালক সেলিম মিয়া জানান, শহরের বিভিন্ন এলাকায় কাজের ফাঁকে তিনি প্রায়ই চাঁনু মিয়ার চিত্রকর্ম দেখতে থেমে যান। তার ভাষায়, “মানুষের আগ্রহ দেখলেই বোঝা যায়, তার কাজ অনেকের ভালো লাগে।”
স্থানীয় কবি মাহমুদ কামাল মনে করেন, চাঁনু মিয়ার শিল্পকর্মে ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগের প্রতিফলন রয়েছে, যা দর্শকদের আকৃষ্ট করে।
টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র মাহমুদা বেগম জেবু বলেন, চাঁনু মিয়া দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় পরিচিত একজন মানুষ। তার মধ্যে সৃজনশীলতার বিশেষ গুণ রয়েছে। তিনি মনে করেন, যথাযথ সামাজিক ও চিকিৎসা সহায়তা পেলে চাঁনু মিয়া আরও ইতিবাচকভাবে নিজের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেতে পারেন।
তবে চাঁনু মিয়ার ব্যক্তিগত জীবন, মানসিক স্বাস্থ্য কিংবা তার শিল্পকর্মের পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে স্থানীয়দের মধ্যে নানা ধরনের ধারণা প্রচলিত থাকলেও সেগুলোর স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য যাচাই পাওয়া যায়নি। ফলে এ ধরনের দাবিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়।
সংস্কৃতিপ্রেমী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, শিল্পচর্চার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে চাঁনু মিয়ার মতো প্রান্তিক শিল্পীরা সমাজে আরও বড় পরিসরে অবদান রাখতে পারেন। টাঙ্গাইলের দেয়ালে ছড়িয়ে থাকা তার শিল্পকর্ম ইতোমধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে এক বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
