জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে নারী, শিশু, কৃষক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকেলে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে নারী ও শিশুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব কৃষি উন্নয়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এসব তথ্য তুলে ধরেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ ফারুক।
ধারণাপত্রে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের গ্রাউন্ডসওয়েল রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ২২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত বা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ড. ফারুক বলেন, জাতিসংঘের আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (আইপিসিসি) জলবায়ু পরিবর্তনকে মানবসভ্যতার অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, খরা, বজ্রপাত এবং তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগের তীব্রতা ও ঘনত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান কার্বন নিঃসরণের ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে।
সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলেও মানুষের অনুভূত তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে ড. ফারুক বলেন, ১৯৯৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে তাপপ্রবাহের দিনের সংখ্যা প্রায় ১২ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়েও তিনি আলোকপাত করেন। তাঁর মতে, গ্রামীণ সমাজে নারীরা প্রায়ই পরিবারের অন্য সদস্যদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিজেদের খাদ্যগ্রহণ কমিয়ে দেন। ফলে রক্তস্বল্পতা, অপুষ্টি এবং মাতৃস্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। অন্যদিকে শিশুদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি, খর্বাকৃতি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতির উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় ২০ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৭২ হাজার শিশু ছিল। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, একই বছরে তাপপ্রবাহ, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কম আলোচিত কিন্তু গুরুতর প্রভাব হলো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা এবং তাপপ্রবাহের কারণে প্রতিবছর লাখো শিক্ষার্থী স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর পড়ছে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ময়মনসিংহ জেলা এডাবের সভাপতি খন্দকার ফারুক আহমেদ। প্রধান অতিথি ছিলেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব কৃষি সম্প্রসারণ, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা জোরদার এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
