অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর কথা বলে প্রায় ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে প্রতারক চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্যরা। তারা দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

গত সোমবার বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আলমগীর তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিভূক্ত করেন। মঙ্গলবার দুপুরে এক প্রেসবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করে পিবিআই।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার ডাঙ্গির ছলেয়াপাড়া গ্রামের মোঃ খাইরুল ইসলাম-(২৪) ও একই উপজেলার বকসাপাড়ার বাসিন্দা মোঃ জাবেদুল ইসলাম-(৩৮)।

গত রোববার রাতে নীলফামারী সৈয়দপুরস্থ জিকরুল হক রোডের মোবাইল মার্ট নামের বিকাশ অফিস থেকে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। চলতি বছরের ১৫ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এর ২২ ধারায় মামলা দায়ের করেন মোহাম্মদ সামাল।

পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্র অস্ট্রেলিয়ার দুটি মুঠোফোন নম্বর থেকে ইমো অ্যাপের মাধ্যমে মোহাম্মদ সামালের সাথে যোগাযোগ করে। মোহাম্মদ সামালকে উচ্চ বেতনে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর মিথ্যা প্রলোভন দেখান তারা। প্রতারক চক্রটি বিভিন্ন সময় সামালকে দিয়ে তাদের দেওয়া নির্দিষ্ট বিকাশ নম্বরগুলোতে টাকা পাঠাতে প্রলুব্ধ করে। তারা গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ১ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে সামাল ও তাঁর আত্মীয়-স্বজন থেকে বিকাশের মাধ্যমে অনুমানিক প্রায় ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। প্রতারক চক্রের সদস্যরা এই টাকা আত্মসাৎ করেন। প্রতারক চক্রটি একপর্যায়ে সামালের সঙ্গে সকল প্রকার যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এতে সামাল নিঃস্ব হয়ে পড়েন।

চলতি বছরের গত ১৫ মার্চ প্রতারক চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে সরাইল থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এর ২২ ধারায় মামলা দায়ের করেন মোহাম্মদ সামাল।

পিবিআই স্ব-উদ্যোগে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন। পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহাদাত হোসেন তথ্য-প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা বিকাশ নম্বরসমূহের ‘আপনার গ্রাহককে জানুন’ (কেওয়াইসি) ও স্টেটমেন্ট পর্যালোচনা করেন তিনি। তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের শনাক্ত করে পিবিআই।

গত রোববার পিবিআইয়ের একটি চৌকস দল নীলফামারীর সৈয়দপুর এলাকায় অভিযান চালায়। সেসময় নীলফামারীর সৈয়দপুরের জিকরুল হক রোডের মোবাইল মার্ট নামের বিকাশ কার্যালয় থেকে সাইবার ও ভিসা প্রতারকচক্রের মূলহোতা খাইরুল ও বিকাশের বিতরণ বিক্রয় কর্মকর্তা (ডিএসও) জাবেদুলকে গ্রেপ্তার কওে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়টি পিবিআইয়ের কাছে স্বীকার করেছে তারা।

গত সোমবার সন্ধ্যায় তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আলমগীরের আদালতে ঘটনার দায় স্বাীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এই চক্রের অন্যতম প্রধান আসামী প্রাণ ইসলাম। তিনি খায়রুলকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে একটি ইনফিনিক্স মুঠোফোন কিনে দেন এবং মানুষকে ধোকা দেওয়ার ভিডিও তৈরির বিষয়ে ৫-৬ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ করান। এরপর খাইরুলকে ‘আরিফ মন্ডল’ ছদ্মনাম দিয়ে একটি ভুয়া ভিডিও তৈরি করা হয়। ভিডিওতে খায়রুল নিজেকে সৌদি প্রবাসী বলে দাবি করে এবং মিথ্যা প্রচারণা চালায় যে, তিনি বিভিন্ন জায়গায় প্রতারিত হয়েছেন। পরে আন্তর্জাতিক আরটিএস কোম্পানির জিএম ‘বদরুজ্জামান বাদলের (পলাতক আসামী প্রাণ ইসলাম) মাধ্যমে স্বল্প খরচে সৌদি আরব থেকে অস্ট্রেলিয়া গিয়ে সফল হয়েছেন এবং প্রচুর টাকা উপার্জন করছেন। এই ভুয়া ভিডিও ও পোস্ট ফেসবুকে তারা বুস্ট করে প্রবাসী সরল মানুষ ও সৌদি প্রবাসীদের ফাঁদে ফেলার পায়তাঁরা করেন। এই ভুয়া ভিডিও তৈরির বিনিময়ে খাইরুলকে তারা আড়াই লাখ টাকা দিয়েছিল। আর জাবেদুল বিকাশের নিজের পদের অপব্যবহার করে বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে সামালসহ অনেকের কাছ থেকে টাকা এনে নগদায়ন করে আত্মসাৎ করেন। পেমেন্ট সিমের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ ক্লিয়ারিং ও লেনদেনের গতিপথ পরিবর্তনের কাজে জাবেদুল সরাসরি চক্রটিকে সহায়তা করে আসছিল। এই অবৈধ লেনদেনের জন্য জাবেদুল প্রতি লাখে ৫০০ টাকা এবং হাজারে ৫ টাকা হারে কমিশন নিত। এই চক্রটি গত ৪ মাসে প্রায় ৭০-৮০ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন সম্পন্ন করেছে।

এ ব্যাপারে পিবিআই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শচীন চাকমা বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরাসহ পলাতক আসামিরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই আর্ন্তর্জাতিক প্রতারণা নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে আসছিল। চক্রের অন্যান্য পলাতক সদস্যদের গ্রেপ্তারসহ আত্মসাৎকৃত টাকা উদ্ধারের পিবিআইয়ের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।