ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় “প্রয়াস” নামে একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ফোরকান-(২৯) নামে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় নিরাময় কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালককে প্রধান করে ৭জনের বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরো ৪/৫জনকে আসামী করা হয়।
সোমবার নিহতের বাবা আবদুর রশিদ বাদী হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই মামলাটি দায়ের করেন।
সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফনান সুমী এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা ও সাধারণ ডায়েরি হয়েছে কিনা যাচাইসহ তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলায় শহরের ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকার একটি তিনতলা ভবনে অবস্থিত “প্রয়াস” মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মোঃ ইকরামুল হক ওরফে রুবেলকে (৪৫) প্রধান আসামী করা হয়।
অন্য আসামীরা হলেন মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক নরসিংদী জেলার প্রমোদ কুমার বর্মন- (৪৬), সহযোগী জেলা শহরের কান্দিপাড়ার রিয়াদ আহমদ ওরফে রকসি-(২৫), সাথি-(৩০), আরিফ- (৩২), সাকিব-(২৫) ও শাহরিয়ার-(৩৩)। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরো ৪/৫জনকে আসামী করা হয়।
মারা যাওয়া ফোরকান জেলার নবীনগর উপজেলার নাটঘর ইউনিয়নের কুড়িঘর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি কাতার প্রবাসী ছিলেন। গত ছয় মাস আগে কাতার থেকে ছুটিতে দেশে আসেন। দেশে আসার দুই মাস পর তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন।
এর আগে গত ১৮ আগস্ট রাতে ওই মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালকদের বিরুদ্ধে সেখানে চিকিৎসাধীন রোগী মোঃ ফোরকানকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পরদিন ১৯ আগস্ট দুপুরে এলাকার লোকজন সেখানে ভাংচুর চালালে নিরাময় কেন্দ্রে থাকা ৪০ জন রোগী এক সাথে পালিয়ে যান। এঘটনায় সদর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে গত ১২ আগস্ট মোঃ ফোরকান মিয়াকে চিকিৎসার জন্য “প্রয়াস” মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে তিন মাসের জন্য ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসার ৭০ হাজার টাকার মধ্যে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের মালিক ইকরামুল হক ও পরিচালক প্রমোদ কুমার বর্মনকে ভর্তির সময় ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়। বাকী ৫০ হাজার টাকা এক মাসের মধ্যে পরিশোধের বিষয়ে আলােচনা হয়।
ভর্তির পরদিন ফোরকান বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে তাঁর বাবাকে জানান যে নিরাময় কেন্দ্রের লোকজন তাঁকে মারাত্মকভাবে মারধর করে। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে ফোরকানকে দেখতে ফল-মূল নিয়ে গত ১৪ আগস্ট মাদক নিরাময় কেন্দ্রে যান ভাগিনা মোঃ আশরাফ। সেসময় অফিস কক্ষে ফোরকান দৌঁড়ে এসে চিৎকার দিয়ে মারধরের কথা ভাগিনাকে জানান। তাকে ভেতরে নিয়ে যেতে মামলার অন্যান্য আসামীদের নির্দেশ দেন ইকরামুল হক। অন্যান্য আসামীরা এলোপাথারীভাবে মারধর করে ভেতরে নিয়ে তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন করে। ফোরকানের চিৎকার শুনে ইকরামুলের কাছে নির্যাতনের কারণ জানতে চান ভাগিনা আশরাফ। শারীরিক নির্যাতন না করলে মাদকাসক্তের নেশা দূর হবে না বলে জানান ইকরামুল।
পরে মামলার বাদী জানতে পারে যে গত ১৮ আগস্ট রাত ৮টা থেকে ১২টার মধ্যে ফোরকানকে আসামীরা পরিকল্পিতভাবে দফায় দফায় অমানুষিকভাবে মারধর করে। এক পর্যায়ে নিরাময় কেন্দ্রের মেঝেতে শুয়ায়ে দুই হাতে দুইজন চেপে ধরে এবং দুইজন দুই দুই পা দুই দিকে টেনে পাড়া দিয়ে ধরে রাখে। সেসময় অন্য একজন আসামী ফোরকানের অন্ডকোষে চাপ দিতে থাকে। পরক্ষণে অপর আরেক আসামী জালিবেত দিয়ে তাঁর গোপনাঙ্গে আঘাত করে এবং আরেকজন বুকের উপর উঠে পাড়া দিয়ে ঝুকি দেয়। এক পর্যায়ে মুখ দিয়ে রক্ত বের হলে ফোরকান অচেতন হয়ে পড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। জ্ঞান না ফেরায় নিরাময় কেন্দ্রের লোকজন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরী বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নির্যাতন করার দৃশ্য দেখে এবং ফোরকানের মৃত্যুর সংবাদ শুনে অন্যান্য চিকিৎসাধীন মাদকাসক্ত রোগীরা ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে নিরাময় কেন্দ্রের জানালা ভেঙ্গে পালিয়ে যান। ঘটনার পর থেকে আসামীরা পলাতক রয়েছে এবং মাদক নিরাময় কেন্দ্রটি বন্ধ আছে। আসামীরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় ফোরকান হত্যার বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার জন্য চেষ্টা করছে। নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদন আসামীদের ইচ্ছা অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে ২০১৪ সালের ৯ আগস্ট শহরের কান্দিপাড়ার আতিকুল ইসলাম ওরফে শাকিল-(৩০) নামের এক যুবককে হত্যার পর লাশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের বারান্দায় রেখে যাওয়ার অভিযোগ আছে ওই নিরাময় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় মামলাও হয়।
