বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট নিরসন এবং শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।
বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত সাত বছরে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাদু পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নাব্যতা ও পানিপ্রবাহ সংকটে থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদী পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও এর আওতায় নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল এবং ইছামতী নদী ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রথম ধাপে গড়াই-মধুমতি নদীর ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার এবং হিসনা নদী ব্যবস্থার ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার এলাকায় ড্রেজিং ও পুনঃখনন কাজ পরিচালিত হবে। এছাড়া গড়াই অফ-টেকে ১৫টি স্পিলওয়ে, নেভিগেশন লক, ফিশ পাস এবং ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। চন্দনা ও হিসনা নদীতেও একাধিক স্পিলওয়ে এবং প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
সরকারের দাবি, প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়িত হলে খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের অন্তত ১৯টি জেলার ১২০টির বেশি উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে। কৃষি উৎপাদন, নদীপথে নৌ চলাচল, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প এলাকা দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত। এর আওতায় ২৬টি জেলার ১৬৩টি উপজেলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষ করে কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, রাজশাহী, নাটোর ও সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো এই প্রকল্প থেকে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বড় ব্যয়ের এ প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, সময়মতো কাজ সম্পন্ন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও ভবিষ্যতে বিস্তারিত মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলোর অন্যতম। সরকার গঠনের পর প্রকল্পটির অনুমোদনকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।