বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটের চরাঞ্চলে তরুণ সংগঠক মোঃ নাঈম রহমান গড়ে তুলেছেন একটি অনন্য কমিউনিটি মডেল। যেখানে একসাথে সমাধান দেওয়া হচ্ছে শিশুশিক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, জলবায়ু সুবিচার, নারীর ক্ষমতায়ন ও দুর্যোগ মোকাবিলার মতো বৈশ্বিক সংকটের।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে নাঈম প্রতিষ্ঠা করেন ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’। চরাঞ্চলের শিশুদের সবচেয়ে বড় সংকট ‘অভিভাবক শূন্যতা’ দূর করাই এর মূল লক্ষ্য। পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে শিশুরা পাচ্ছে প্রযুক্তি শিক্ষা। নিয়মিত উঠান বৈঠকে অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে তাদের সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় যুক্ত করা হয়। ইতিমধ্যেই শতাধিক ঝরে পড়া শিশু শিক্ষার মূলস্রোতে ফিরেছে।

শুধু শিক্ষা নয়, নাঈমের চেষ্টায় চরাঞ্চলের প্রায় ৮০০ পরিবার বাল্যবিবাহ না দেওয়ার শপথ নিয়েছে। শিশুশ্রম ও মাদক প্রতিরোধেও গড়ে উঠেছে কমিউনিটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। আর যাতায়াতের দুর্গমতাই যাতে শিক্ষার পথে বাধা না হয়, সেজন্য নৌকা ও ঘোড়ার গাড়িতে শিশুদের বিনামূল্যে যাতায়াত নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি একটি কম খরচের, কমিউনিটি-চালিত সমাধান।

নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতাও এই মডেলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। চরাঞ্চলের মায়েদের সেলাই প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উন্নত বীজ, হাঁস-মুরগি ও কৃষি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অভিভাবকদের বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। বন্যা ও দুর্যোগের সময় নারীদের জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন ও সুপেয় পানির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করেছে তাঁর দল।

জলবায়ু আন্দোলনেও সোচ্চার নাঈম। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সংহতি জানিয়ে তিনি তরুণদের নিয়ে বিভিন্ন সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা করেন। এক লক্ষ বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ইতিমধ্যে দশ হাজার গাছ বিতরণ ও রোপণ সম্পন্ন করেছেন। করোনাকালে জীবনঝুঁকি নিয়ে মাস্ক, লিফলেট ও বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা পৌঁছে দিয়েছেন মানুষের দোরগোড়ায়। বন্যায় ত্রাণ ও উদ্ধার কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন রেড ক্রিসেন্টের দলনেতা ও প্রশিক্ষক হিসেবে।

উল্লেখ্য, স্কাউটস ও ছাত্র সংসদের মতো প্ল্যাটফর্মে থেকে নেতৃত্বের সূচনা। পরে অর্ধশতাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে একত্র করে গড়ে তুলেছেন সম্মিলিত স্বেচ্ছাসেবী পরিষদ। বর্তমানে বসুন্ধরা শুভসংঘ লালমনিরহাট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জেলাজুড়ে কার্যক্রম সমন্বয় করছেন। বাংলাদেশের ৬০টি জেলা ভ্রমণ করে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যও সামাজিক মাধ্যমে তুলে ধরেছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই মডেল প্রাসঙ্গিক কারণ এটি সম্পূর্ণ উন্নয়নশীল দরিদ্র চরাঞ্চলের জন্য উপযোগী, কম খরচে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে টেকসই এবং জাতিসংঘের SDG’র একাধিক লক্ষ্যের বাস্তব রূপ। নাঈম রহমানের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, বড় বাজেট ছাড়াই শুধু সৃজনশীল নেতৃত্ব আর কমিউনিটির মালিকানায় বদলে ফেলা যায় অনগ্রসর জনপদের ভাগ্য। বিশ্বের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও এটি এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।