কুমিল্লার লাকসামে মাদ্রাসাছাত্রী সামিয়া আক্তারের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে যৌননিপীড়নের আলামত পাওয়ার পরও এক বছর পেরিয়ে গেলেও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি পুলিশ। এতে নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

নিহত সামিয়া আক্তার লাকসাম ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট পৌরসভার নাওগোদা গ্রামে। বাবা নিজাম উদ্দিন প্রবাসে থাকেন।

মামলার নথি ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল দিবাগত রাতে লাকসাম পৌরসভা কার্যালয় সংলগ্ন ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসার পাঁচতলা ভবনের পাশ থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় সামিয়াকে উদ্ধার করা হয়। প্রথমে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে ১৮ এপ্রিল দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

ঘটনার পর গত বছরের ২৭ আগস্ট আদালতে দাখিল করা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে সামিয়ার শরীরে যৌননিপীড়নের আলামত উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে তার যৌনাঙ্গ ও পায়ুপথে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে ঘটনার দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়নি। এতে মামলার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সামিয়ার মা শারমিন বেগম অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই তার মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং মামলা গ্রহণ থেকে শুরু করে তদন্ত পর্যন্ত নানা পর্যায়ে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, “ময়নাতদন্তে যৌন নির্যাতনের আলামত থাকার পরও পুলিশ এখনো কাউকে বিচারের মুখোমুখি করতে পারেনি। আমরা ন্যায়বিচার চাই।”

পরিবারের অভিযোগ, হত্যা মামলায় নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করতে চাইলেও পুলিশ তা গ্রহণ করেনি এবং অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা নেয়।

এদিকে সামিয়ার মৃত্যুর পর লাকসামজুড়ে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হলেও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

অভিযোগ অস্বীকার করে ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসার প্রধান মো. জামাল উদ্দিন বলেন, সামিয়া আবাসিকে থাকতে অনাগ্রহী ছিল এবং ঘটনার রাতে মাদ্রাসার পাঁচতলার জানালা দিয়ে পালাতে গিয়ে পড়ে যায়। তিনি দাবি করেন, এটি দুর্ঘটনা।

তবে নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের একাংশ এ ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে বলছেন, ময়নাতদন্তের ফলাফল দুর্ঘটনার দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বর্তমান লাকসাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাকসুদ আহাম্মদ বলেন, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে আরও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি জানান, তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হওয়ায় নতুন কর্মকর্তার কাছে মামলার দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়েছে।

এ ঘটনায় দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার, মানবাধিকারকর্মী ও স্থানীয় সচেতন মহল।

উপসংহার:
ময়নাতদন্তে যৌননিপীড়নের আলামত স্পষ্ট হওয়ার পরও তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা সামিয়ার মৃত্যুর বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। পরিবার বলছে, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এ মামলায় আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।