আমন ধান ঘিরে স্বপ্ন দেখছিলেন কৃষক মো. আল-আমিন (৩৪)। ফসল ঘরে তুলতে পারলে পরিবারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি কৃষিকাজের দেনাও শোধ করতে পারবেন—এমন প্রত্যাশা ছিল তাঁর। কিন্তু রাতের আঁধারে ধানখেতে আগাছানাশক প্রয়োগ করে ফসল নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। এতে প্রায় ১০ কাঠা জমির আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। ফসল হারানোর আশঙ্কায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা।

ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের উত্তর বড়জোড়া গ্রামে। আল-আমিনের অভিযোগ, গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে তাঁর ধানখেতে আগাছানাশক প্রয়োগ করা হয়। পরদিন বুধবার সকালে জমিতে গিয়ে তিনি ধানগাছ হলুদ হয়ে যেতে দেখেন। পরে অন্য জমিতেও একই অবস্থা দেখতে পান। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে ঈশ্বরগঞ্জ থানা-পুলিশ।

আল-আমিনের দাবি, জমিজমা নিয়ে একই গ্রামের নজরুল ইসলাম ও উবায়দুল হকের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। সেই বিরোধের জের ধরে ধানখেতে আগাছানাশক প্রয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তবে এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আল-আমিন বলেন, “অনেক আশা নিয়ে আমন ধানের চারা রোপণ করেছিলাম। ধারদেনা করে ও কষ্টের টাকা খরচ করে জমি তৈরি, চারা রোপণ এবং পরিচর্যা করেছি। আমনের মৌসুমে ধান ঘরে তোলার অপেক্ষায় ছিলাম। ভেবেছিলাম, ফসল বিক্রি করে পরিবারের খরচ চালাব, কৃষিকাজের দেনাও শোধ করব। কিন্তু রাতের আঁধারে কে বা কারা জমিতে আগাছানাশক প্রয়োগ করে আমাদের সেই স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে। জমিজমা নিয়ে বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু ফসলের সঙ্গে এমন শত্রুতা কেন? এখন কীভাবে খরচের টাকা তুলব, কীভাবে সংসার চালাব—তা ভেবে দিশা পাচ্ছি না। আমরা এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”

আল-আমিনের বড় ভাই মো. সাইফুল ইসলাম (৫৫) বলেন, “ধানখেতের সঙ্গে কিসের শত্রুতা? এই ফসলই কৃষকের বেঁচে থাকার অবলম্বন। একটি ফসল ফলাতে কত পরিশ্রম, কত টাকা খরচ করতে হয়, তা কৃষকই জানেন। সেই ফসল নষ্ট হয়ে গেলে শুধু একজন কৃষক নন, তাঁর পুরো পরিবার বিপদে পড়ে। জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে আইনগতভাবে তার সমাধান করা যায়। কিন্তু কারও রিজিকের ওপর আঘাত করে একটি পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।”

অভিযোগ অস্বীকার প্রতিপক্ষের

এ ঘটনায় একই গ্রামের মো. নজরুল ইসলাম (৫০) ও উবায়দুল হকের (৩৮) বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন আল-আমিন। তাঁদের দুজনের বাবার নাম মো. মোসলেম উদ্দিন বলে জানা গেছে। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তাঁদের বাড়িতে গিয়েও পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে অভিযুক্তদের পক্ষে নাজিম উদ্দীন (৪০) অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আল-আমিনরা নিজেরাই নিজেদের জমিতে কীটনাশক দিয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছেন।”

ধানগাছ নষ্টের কারণ নিশ্চিত নয়: কৃষি কর্মকর্তা

ধানগাছ হলুদ হয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রিপা রানী চৌহান বলেন, “কী কারণে ধানগাছগুলো হলুদ হয়ে নষ্ট হয়েছে, তা প্রয়োজনীয় তথ্য ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। আমরা পরিদর্শন করেছি।”

তদন্তের আশ্বাস পুলিশের

ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজ্জাদ রোমন বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশের একটি দল পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ফসলের ক্ষতির ঘটনায় কৃষক আল-আমিন আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন। তবে ধানগাছ নষ্ট হওয়ার প্রকৃত কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং এর পেছনে কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।