বাংলাদেশের জ্বালানি অবকাঠামোর একটি বড় প্রকল্প—কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং (এসপিএম)—দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে আছে। প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প চালু না হওয়ায় তেল খালাস, পরিবহন এবং মজুত—সব ক্ষেত্রেই সম্ভাব্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ।

২০২৪ সালে নির্মাণকাজ শেষ হলেও অপারেটর নিয়োগ জটিলতায় এখনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে প্রকল্পটির গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

মহেশখালীতে নির্মিত ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংকে প্রায় দুই লাখ টন তেল মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে—যা দিয়ে এক মাসের ক্রুড অয়েল এবং এক সপ্তাহের ডিজেল চাহিদা মেটানো সম্ভব। কিন্তু এসব ট্যাংক এখনো খালি পড়ে আছে।

এসপিএম প্রকল্পের আওতায় বঙ্গোপসাগরে ভাসমান বয়া, গভীর সমুদ্র থেকে মহেশখালী হয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত প্রায় ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন এবং বৃহৎ পাম্পিং অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে বড় জাহাজ থেকে তেল খালাস করতে ‘লাইটারেজ’ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হয়, যেখানে গভীর সমুদ্র থেকে ছোট জাহাজে তেল এনে কর্ণফুলী চ্যানেল হয়ে শোধনাগারে পৌঁছানো হয়। এতে সময় লাগে প্রায় ১১ দিন। বিপরীতে পাইপলাইন ব্যবস্থায় একই কাজ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আধুনিক পদ্ধতি চালু হলে শুধু সময় ও খরচ কমবে না, পরিবহনজনিত অপচয় কমার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাও নিশ্চিত হবে।

প্রকল্পটি চালু না হওয়ার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অপারেটর নিয়োগের জটিলতা। পূর্ববর্তী সরকারের সময় বিশেষ আইনে দরপত্র ছাড়াই বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরবর্তীতে সেই আইনি কাঠামো বাতিল হওয়ায় নতুন করে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়। এতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকটকালে এই অবকাঠামো চালু থাকলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য স্থিতিশীলতা আসতে পারত। একই সঙ্গে মজুত সক্ষমতা কৌশলগত নিরাপত্তা হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারত।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ তামিম মনে করেন, অগ্রাধিকারভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে এই বিলম্ব এড়ানো সম্ভব ছিল। তার মতে, পাইপলাইনভিত্তিক তেল পরিবহন দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমামও দ্রুত প্রকল্পটি চালুর ওপর জোর দিয়েছেন। তার ভাষায়, “এ ধরনের আধুনিক অবকাঠামো অচল পড়ে থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে এবং দ্রুত অপারেটর নিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পটি চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

এদিকে প্রকল্প পরিচালনার জন্য একটি পৃথক কোম্পানি গঠন করা হলেও আপাতত কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘ বিলম্বের ফলে একদিকে যেমন আর্থিক সুবিধা হাতছাড়া হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণের চাপ বহাল থাকায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।