টাঙ্গাইলে পরিবারের সদস্যদের অবহেলায় রাস্তার পাশে ফেলে যাওয়া শতবর্ষী অন্ধপ্রায় বৃদ্ধ মফিজ উদ্দিনকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে তাঁর চিকিৎসা, ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার দায়িত্ব ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।

ঘটনাটি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বৈল্যা এলাকায়। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাতে রাস্তার পাশে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকা বৃদ্ধকে উদ্ধারের পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইল শহরের এনায়েতপুর এলাকার বাসিন্দা মফিজ উদ্দিন তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। প্রায় আট বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি পারিবারিকভাবে অবহেলার শিকার হন। এক ছেলে মারা গেছেন, বড় ছেলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং ছোট ছেলে আলাদা বসবাস করেন।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের শেষ সম্বল হিসেবে থাকা সম্পত্তিও তিনি নামমাত্র মূল্যে দুই ছেলের নামে লিখে দেন। এরপর থেকেই তাঁর পারিবারিক অবস্থান আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এলাকাবাসীর দাবি, তিনি দীর্ঘদিন পক্ষাঘাতগ্রস্ত বড় ছেলে শামসুলের বাড়িতে বসবাস করছিলেন। ছেলের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর নাতনি ও তার স্বামী ওই বাড়িতে থাকতেন। তারা বৃদ্ধের দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহী ছিলেন। একপর্যায়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁকে বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে রাস্তার পাশে রেখে চলে যান বলে অভিযোগ ওঠে।

ঘটনার খবর পেয়ে প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু তাৎক্ষণিকভাবে টাঙ্গাইল সদর থানাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। রাতেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে নিরাপদে তাঁর ছোট মেয়ে রিনা বেগমের জিম্মায় পৌঁছে দেয়।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে বৃদ্ধের নাতনিকে থানায় নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযুক্ত নাতনির স্বামী পুলিশ উপস্থিত হওয়ার আগেই পালিয়ে যান।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমদিকে ছোট মেয়ে রিনা বেগম বাবার দায়িত্ব নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। পরে প্রতিমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিলে তিনি বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে সম্মত হন।

শুধু উদ্ধার কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থাকেননি প্রতিমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, বৃদ্ধ মফিজ উদ্দিনের চিকিৎসা, খাদ্য, বাসস্থান এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় ব্যক্তিগতভাবে বহন করবেন। পাশাপাশি দ্রুত তাঁর জন্য সরকারি বৃদ্ধভাতার ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

এছাড়া পারিবারিক কারণে মেয়ের বাড়িতে থাকা সম্ভব না হলে তাঁর জন্য পৃথক বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয়ও নিজে বহনের আশ্বাস দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

টাঙ্গাইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিন বলেন,
“প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে। বর্তমানে তিনি তাঁর ছোট মেয়ের হেফাজতে রয়েছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নাতনিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে তার স্বামী পালিয়ে গেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন,
“একজন অসহায় প্রবীণ মানুষকে এভাবে রাস্তায় ফেলে রেখে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অমানবিক। বাবা-মা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তাঁদের প্রতি দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা গ্রহণযোগ্য নয়। যতদিন প্রয়োজন, এই বৃদ্ধের চিকিৎসা, থাকা-খাওয়া ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার দায়িত্ব আমি পালন করব। একই সঙ্গে যারা তাঁকে পরিত্যাগ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সমাজের প্রতিটি মানুষকে প্রবীণদের পাশে দাঁড়াতে হবে।”

ঘটনাটি প্রবীণদের প্রতি পারিবারিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানবিকতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। স্থানীয়দের মতে, একজন অসহায় বৃদ্ধের পাশে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপ যেমন স্বস্তির বার্তা দিয়েছে, তেমনি প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধে আরও কার্যকর সামাজিক ও আইনি উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।