কথায় আছে, যে এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা যত উন্নত, সেই এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার মানও তত উন্নত। প্রায় ১১০ বছরের পুরোনো এক স্বপ্ন এবার বাস্তবায়নের পথে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে। সড়কপথের পাশাপাশি এবার রেল যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাবনায় গোটা উপজেলায় বইছে আনন্দের আমেজ।

চায়ের দোকান, হাট-বাজার, শপিংমল থেকে শুরু করে গ্রামের অলিগলিতেও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু রেললাইন সম্প্রসারণ। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি দুর্গাপুরবাসীর জন্য ঈদের আগেই বড় উপহার।

এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ। এ দাবিতে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচিও পালন করেছেন স্থানীয়রা। সেই দাবির প্রেক্ষিতেই নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের উদ্যোগে জারিয়া-ঝাঞ্জাইল থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার রেললাইন সম্প্রসারণের সম্ভাবনা যাচাই কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।

এ লক্ষ্যে আগামী ১৩ মে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শনে আসবেন বলে জানা গেছে।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে হাওরাঞ্চলের মাছ, কৃষিপণ্য, ধান, সুসং পরগনার হাতি ও সাদামাটি পরিবহনের সুবিধার্থে ময়মনসিংহের সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের রেল সংযোগ গড়ে তোলা হয়। পরবর্তীতে সেই রেললাইন নেত্রকোনা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়।

দুর্গাপুর ছিল সুসং রাজ্যের রাজধানী। সে সময় শ্যামগঞ্জ থেকে জারিয়া-ঝাঞ্জাইল হয়ে দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, জারিয়ার নাটোরকোনা এলাকায় এখনো সেই পরিকল্পনার প্রাথমিক কাজের কিছু চিহ্ন রয়েছে।

তবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, টংক আন্দোলন, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে প্রকল্পটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।

স্থানীয়দের মতে, রেললাইন সম্প্রসারণ হলে দুর্গাপুরের অর্থনীতি, পর্যটন ও কর্মসংস্থানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। সোমেশ্বরী নদী, বিজয়পুরের সাদামাটির পাহাড়, টিলা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকদের আগমন বাড়বে। একই সঙ্গে হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

কৃষিপণ্য, মাছ, স্থানীয় হস্তশিল্প ও খনিজ সম্পদ সহজে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও কৃষকরা।

প্রবীণ সংস্কৃতিজন বীরেশ্বর চক্রবর্তী বলেন, “জীবনের শেষ সময়ে এসে দুর্গাপুরে রেললাইন সম্প্রসারণের উদ্যোগ দেখতে পাব, এটা কখনও ভাবিনি। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খুলে যাবে।”

আদিবাসী নেতা অঞ্জন চিছাম বলেন, “রেললাইন সম্প্রসারণের খবর শুনে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে এলাকার হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।”

দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ সাদাত বলেন, “দুর্গাপুরে যোগদানের পরপরই এমন একটি সম্ভাবনাময় প্রকল্পের খবর পাওয়া অত্যন্ত ইতিবাচক। রেললাইন চালু হলে এ অঞ্চল নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এবার বাস্তবে রূপ নেবে এবং দুর্গাপুর যুক্ত হবে দেশের রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে।