কুড়িগ্রাম পিটিআইয়ে অনিয়মের অভিযোগ: প্রশিক্ষণ ব্যাহত, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে প্রশাসন
কুড়িগ্রাম প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) ঘিরে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক অসঙ্গতির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা, আবাসন সংকট, নোংরা পরিবেশ এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন এখন সমালোচনার মুখে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে ভুয়া বিল-ভাউচার, অতিরিক্ত ভাতা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় দেখিয়ে প্রায় ১১ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সুপারিনটেনডেন্ট জয়নুল আবেদীন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম বাড়তে থাকে। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশ অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়া হচ্ছে এবং প্রশিক্ষণার্থীদের সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
অডিট সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সরকারি নিয়ম অনুসরণ না করে একাধিক খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে—গেস্টরুমে অবস্থান করে বাসাভাড়া বাবদ অর্থ উত্তোলন, ভুয়া ভ্রমণ বিল, প্রশিক্ষণ উপকরণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খাতে অতিরিক্ত ব্যয়, তথ্যপুস্তক ও ম্যাগাজিন ক্রয়ে অনিয়ম, প্রশিক্ষণ ভাতা এবং খাবার খাতে অসঙ্গতি।
অভিযোগ অনুযায়ী, সুপারিনটেনডেন্টের সরকারি বাসভবন সংস্কার ছাড়াই তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের গেস্টরুমে অবস্থান করছেন। যদিও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তার বাসাভাড়া কর্তনের কথা, অভিযোগ রয়েছে—তা না করেই তিনি পূর্ণ ভাতা উত্তোলন করেছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পিটিআই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অংশ অযত্ন ও অবহেলায় জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়েছে। পরীক্ষণ বিদ্যালয়, পুরুষ ও মহিলা হোস্টেলের পরিবেশও নাজুক। কোথাও ভাঙা খাট, নষ্ট ফ্যান, অপরিষ্কার কক্ষ, আবার কোথাও স্যাঁতসেঁতে দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশে থাকতে হচ্ছে প্রশিক্ষণার্থীদের।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া কয়েকজন নারী ও পুরুষ শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রশিক্ষণ শেষে ভাতা পাওয়ার কথা থাকলেও এখনো তারা কোনো অর্থ পাননি। খাবারের বরাদ্দ সম্পর্কেও তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। তাদের অভিযোগ, বরাদ্দের তুলনায় অনেক কম মানের খাবার দেওয়া হয়েছে এবং পুরোনো ব্যানার ব্যবহার করেই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগ থেকে আসা কয়েকজন প্রশিক্ষকও আবাসন ও পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা জানান, পিটিআইয়ের ভেতরে পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত থাকার ব্যবস্থা না থাকায় বাইরে হোটেলে থাকতে হচ্ছে। মহিলা হোস্টেলের পরিবেশও বসবাসের অনুপযোগী বলে অভিযোগ করেন তারা।
অভিভাবকদের অভিযোগ আরও উদ্বেগজনক। স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক বলেন, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফটক দিনরাত খোলা থাকায় বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াত চলছে। বিদ্যালয় মাঠে অসামাজিক কর্মকাণ্ড, মাদকসেবন ও জুয়া খেলার ঘটনাও ঘটছে বলে তারা দাবি করেন। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরেই অবকাঠামোগত সমস্যা থাকলেও তা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সংস্কারের জন্য প্রাক্কলন চাইলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তারা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কুড়িগ্রাম পিটিআইয়ের সুপারিনটেনডেন্ট জয়নুল আবেদীন। তিনি বলেন, অডিট টিম কিছু অসঙ্গতির বিষয় তুলে ধরেছে এবং সেসবের যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীদের ভাতা বরাদ্দ এলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে বলেও জানান তিনি।
সরকারি বাসভবনের পরিবর্তে গেস্টরুমে অবস্থানের বিষয়টি স্বীকার করলেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
এদিকে অডিট টিমের সদস্য জয়ন্ত কুমার বলেন, কুড়িগ্রাম পিটিআইয়ের আর্থিক কার্যক্রমে কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির চলমান পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষক, প্রশিক্ষণার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পরিবেশ স্বাভাবিক করা হোক।