বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার একটি বিশাল এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের উপর নির্ভরশীল। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ এবং সামগ্রিক কৃষি জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশ আসে এই প্রাণিসম্পদ খাত থেকে। বর্তমানে বাংলাদেশে গবাদিপশুর সংখ্যা নেহাত কম নয়; প্রায় ২.৫ কোটি গরু, ২.৭ কোটি ছাগল এবং ৪০ কোটির বেশি পোল্ট্রি বা হাঁস-মুরগি এই শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। এই বিশাল প্রাণিসম্পদ কেবল প্রাণিজ আমিষের যোগানই দিচ্ছে না, বরং দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের সরাসরি জীবিকার প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা ও চিকিৎসায় যতটা সচেতনতা প্রদর্শন করি, প্রাণীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে ততটা গুরুত্ব দিই না। অথচ বাস্তবতা হলো, গ্রামের একজন প্রান্তিক কৃষকের একটি গাভী যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন সেটি কেবল একটি প্রাণীর রোগ থাকে না; সেটি হয়ে দাঁড়ায় ওই পুরো পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস এবং তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য একটি চরম ঝুঁকি। এই নিগুঢ় সত্যটিই স্পষ্ট করে দেয় যে, প্রাণিসম্পদ খাত কেবল একটি অর্থনৈতিক খাত নয় বরং এটি আমাদের সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

তবুও এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতের নীরব রক্ষক অর্থাৎ ভেটেরিনারিয়ানদের ভূমিকা আমরা কতটুকু মূল্যায়ন করি? সেই প্রশ্নটি আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ২০০০ সাল থেকে ওয়ার্ল্ড ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে প্রতি বছর বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবস পালন করা হচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য হলো বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভেটেরিনারি পেশার অপরিহার্যতা তুলে ধরা। ২০২৬ সালের এই বিশেষ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ভেটেরিনারিয়ানস: গার্ডিয়ানস অফ ফুড অ্যান্ড হেলথ। এই প্রতিপাদ্যটি বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

সাধারণত আমাদের সমাজে ভেটেরিনারি সেবাকে কেবল পশু চিকিৎসা হিসেবে একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ভেটেরিনারি বিজ্ঞান শুধুমাত্র অসুস্থ প্রাণীর নিরাময় নয়, এটি রোগ প্রতিরোধ, নিরাপদ খাদ্য শৃঙ্খল নিশ্চিতকরণ এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের একটি শক্তিশালী স্তম্ভ। এই সামগ্রিক ব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করার জন্য ওয়ান হেলথ বা এক স্বাস্থ্য ধারণাটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে। এই ধারণা অনুযায়ী মানুষ, প্রাণী এবং আমাদের চারপাশের পরিবেশকে আলাদা কোনো সত্তা হিসেবে নয়, বরং একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া প্রায় ৬০ শতাংশ সংক্রামক রোগ এবং প্রায় ৭৫ শতাংশ নতুন উদীয়মান রোগের মূল উৎস হলো প্রাণী। একে বলা হয় জুনোটিক রোগ। এর অর্থ দাঁড়ায়, যদি কোনো রোগের উৎপত্তি স্থলেই অর্থাৎ প্রাণীর শরীরে থাকাকালীনই সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে তা অতি দ্রুত মহামারী আকারে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করতে পারে। তাই ভেটেরিনারি সেবা আসলে মানব চিকিৎসার কোনো গৌণ বা পরিপূরক অংশ নয় এটি জনস্বাস্থ্য রক্ষার প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর। এই দৃষ্টিকোণ থেকে একজন ভেটেরিনারিয়ানের ভূমিকা কেবল ক্লিনিক বা খামারে সীমাবদ্ধ নয়। তারা রোগ প্রতিরোধ, মহামারী মোকাবিলা, নিরাপদ মাংস ও দুধের যোগান নিশ্চিতকরণ এবং প্রাণী কল্যাণ রক্ষার মাধ্যমে সরাসরি মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজে নিয়োজিত থাকেন।

বাংলাদেশে ২০০৭ সালের বার্ড ফ্লু প্রাদুর্ভাবের কথা আমরা ভুলে যাইনি। সেই সময় পোল্ট্রি খাতে যে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছিল, তা ছিল আমাদের জন্য একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা। প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক পর্যায়েই শত শত পোল্ট্রি খামার আক্রান্ত হয়েছিল এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে প্রায় ১.৫ থেকে ২.৫ মিলিয়ন হাঁস-মুরগি নিধন করতে হয়েছিল। বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাত যেখানে ৪০ কোটিরও বেশি পাখির ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে, সেখানে এই নিধন কার্যক্রমের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে কেবল উৎপাদন ব্যাহত হয়নি, বরং ডিম ও মুরগির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, হাজার হাজার খামারি সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন এবং সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছিল। এর চেয়েও ভীতিজনক তথ্য হলো, এইচফাইভএনওয়ান ধরনের বার্ড ফ্লু যদি মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়, তবে এর মৃত্যুহার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ এটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং একটি চরম জীবনঘাতী ঝুঁকি।

আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তরবঙ্গের কিছু জেলায় অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগের প্রাদুর্ভাব আমাদের নতুন করে সতর্ক করেছে। ডিপার্টমেন্ট অফ লাইভস্টক সার্ভিসেস বা ডিএলএস-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে গবাদিপশুর মধ্যে সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অসচেতনতার কারণে আক্রান্ত পশুর সংস্পর্শে আসা বা মাংস ব্যবহারের ফলে মানুষের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়েছে। এই ঘটনাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে প্রাণীর রোগ মোটেও হালকাভাবে দেখার বিষয় নয়। এখানে ওয়ান হেলথ ধারণাটি প্রয়োগ করা কতটা জরুরি, তা সহজেই অনুমেয়। কারণ প্রাণীর রোগ নিয়ন্ত্রণে যদি ভেটেরিনারিয়ান, চিকিৎসক এবং পরিবেশবিদরা একসাথে কাজ না করেন, তবে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকেই যাবে। প্রাণীর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত না করে মানুষের সুস্বাস্থ্য কল্পনা করা আজ আর সম্ভব নয়।

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমাদের ভেটেরিনারি খাতকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য অনুযায়ী খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভেটেরিনারিয়ানদের ভূমিকা সুসংহত করতে একটি তিন-স্তর বিশিষ্ট সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

প্রথমত, আমাদের নজরদারি বা সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা আরও আধুনিক করতে হবে। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত রোগ পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক রিপোর্টিং এবং রোগের হটস্পটগুলো চিহ্নিত করে রিস্ক ম্যাপিং সিস্টেম চালু করতে হবে। এর ফলে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটার প্রাথমিক পর্যায়েই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে এবং সেটি মহামারী আকার ধারণ করতে পারবে না। এতে করে যেমন প্রাণহানি কমবে, তেমনি আমাদের খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল বা ফুড সাপ্লাই চেইন থাকবে স্থিতিশীল।

দ্বিতীয়ত, দেশের প্রতিটি উপজেলা বা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোবাইল এবং ইমারজেন্সি ভেটেরিনারি রেসপন্স ব্রাঞ্চ বা দ্রুত সাড়াদানকারী দল গঠন করতে হবে। এই দলগুলো আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় ঔষধ নিয়ে সজ্জিত থাকবে, যারা খবর পাওয়া মাত্রই আক্রান্ত স্থানে পৌঁছে চিকিৎসা প্রদান, জরুরি টিকাদান এবং প্রয়োজনে আক্রান্ত এলাকাকে লকডাউন বা কোয়ারেন্টাইন করার সক্ষমতা রাখবে। এর ফলে খামারিদের আর্থিক ক্ষতি যেমন কমানো সম্ভব হবে, তেমনি বাজারে সিন্ডিকেট বা প্যানিক তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকবে না।

তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনসচেতনতা এবং দক্ষ জনবল তৈরি। আমাদের খামারিদের শেখাতে হবে কীভাবে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পশুপালন করতে হয়, নিয়মিত টিকার গুরুত্ব কী এবং অসুস্থ পশুকে কীভাবে আলাদা রাখতে হয়। একই সাথে প্রচুর সংখ্যক দক্ষ ভেটেরিনারিয়ান এবং ফিল্ড টেকনিক্যাল স্টাফ নিয়োগ দিয়ে এই খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।

ভেটেরিনারিয়ানরা কেবল পশুর জীবন রক্ষা করেন না, তারা রক্ষা করেন আমাদের অর্থনীতি, আমাদের খাদ্য এবং সর্বোপরি আমাদের মানবসভ্যতাকে। ২০২৬ সালের বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত- আমরা প্রাণীদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতি গঠনে কাজ করে যাব। কারণ একজন সুস্থ ভেটেরিনারিয়ানই পারেন একটি সুস্থ প্রাণী ও একটি সুস্থ সমাজ উপহার দিতে।

অধ্যাপক ড. মো. সহিদুজ্জামান
গবেষক ও বিশেষজ্ঞ
প্যারাসাইটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ