পানির বিল পরিশোধ করার পরও নতুন বিলে এক থেকে তিন মাসের বকেয়া দেখানো হয়েছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জরিমানাও। মেহেরপুর পৌরসভার এমন ভুল বিল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন পাঁচ শতাধিক গ্রাহক। বিল সংশোধন করতে নিজেদের কাজ ফেলে পৌরসভায় ছুটতে হচ্ছে তাঁদের। নতুন সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিল প্রস্তুত করতে গিয়ে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি পৌর কর্তৃপক্ষের। তবে বিল বিতরণের আগে তথ্য যাচাই না করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, আগের বিল পরিশোধের পরও বকেয়া ও জরিমানার টাকা যুক্ত হওয়ায় তাঁদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কর্তৃপক্ষের আশ্বাস, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে পৌরসভায় গেলে বিল সংশোধন করে দেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মো. রিনু কালবেলাকে বলেন, পৌরসভার পানি সরবরাহের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। সরবরাহ করা পানিতে ময়লা, পোকামাকড় ও মলের মতো দেখতে বস্তু পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের অভাবের মধ্যে এবার যুক্ত হয়েছে বকেয়া ও জরিমানার নামে অতিরিক্ত টাকা দেখানোর অভিযোগ। তাঁর ভাষ্য, এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান বলেন, গতকাল থেকেই পৌরসভার পানির বিলে অতিরিক্ত টাকা দেখানোর অভিযোগ পাচ্ছেন তিনি। তাঁর কাছে আসা অভিযোগ অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে বিতরণ করা সেপ্টেম্বরের পানির বিলে কারও এক মাস, কারও দুই মাস, আবার কারও তিন মাসের বকেয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছে। এর সঙ্গে আরোপ করা হয়েছে জরিমানা। অথচ গ্রাহকদের দাবি, তাঁরা আগের বিল পরিশোধ করেছেন।
কামরুল হাসান বলেন, “বিল প্রস্তুতের পর গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণের আগে সেগুলো যাচাই করার দায়িত্ব নিশ্চয়ই কারও ছিল। কিন্তু বিল বিতরণের পর এখন সাধারণ মানুষকে নিজেদের কাজ ফেলে সময় ও অর্থ ব্যয় করে পৌরসভায় এসে বিল সংশোধন করাতে হচ্ছে। জানতে পেরেছি, একজন-দুজন নয়, পাঁচ শতাধিক পানির বিলে এ ধরনের সমস্যা হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। জনসাধারণকে এভাবে ভোগান্তিতে ফেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
পৌরসভার প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। কামরুল হাসানের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে মেহেরপুর পৌরসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই; প্রশাসকের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে এ ধরনের ভোগান্তি এড়ানো সম্ভব হতো বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, পানির বিলের অসংগতি, পরিশোধিত বিলের বিপরীতে বকেয়া ও জরিমানা আরোপ এবং পানি সরবরাহের মান—সব বিষয়েই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
নতুন সফটওয়্যারে বিল প্রস্তুত, স্বীকার কর্তৃপক্ষের ভুল
পৌরসভার পানি শাখার বিল ক্লার্ক হাবিবুর রহমান বলেন, সব বিলে সমস্যা হয়নি। ২৩ তারিখে যেসব বিল তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোতেই অতিরিক্ত বকেয়া দেখানোর সমস্যা হয়েছে। যাঁদের আগের বিল পরিশোধ করা আছে, তাঁরা পুরোনো ও নতুন বিল নিয়ে এলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধন করে দেওয়া হচ্ছে।
বিল প্রস্তুতকারী পৌরসভার নিম্নমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর শেফালী খাতুন বলেন, সফটওয়্যারের কারণে সমস্যাটি হয়েছে। এত দিন ম্যানুয়ালি পানির বিল প্রস্তুত করা হতো। গত মাস থেকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিল তৈরি করা হচ্ছে।
পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মাসুদ রানা বলেন, বিল বিতরণের আগে পানি শাখা থেকে তথ্য যাচাই করা হয়নি। এটি বড় ভুল, যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আগে ম্যানুয়ালি বিল প্রস্তুত করা হলেও চলতি মাস থেকে অনলাইনে বিল তৈরি করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকের তথ্য অনলাইনে সঠিকভাবে হালনাগাদ না হওয়ায় এ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান তিনি।
মাসুদ রানা আরও বলেন, ভুক্তভোগীরা পৌরসভায় এলে তাঁদের বিল তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধন করে দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে মেহেরপুর পৌরসভার প্রশাসক ও মেহেরপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক তরিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রথমবার বিল অটোমেশনের কারণে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পৌরসভার পক্ষ থেকে মাইকিং করে পৌরবাসীকে আতঙ্কিত না হয়ে পৌরসভায় এসে বিল সংশোধন করিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন সফটওয়্যারে বিল প্রস্তুতের ত্রুটির কারণে সৃষ্ট এ ভোগান্তির অবসানে দ্রুত সংশোধন, বিল প্রস্তুতের আগে তথ্য যাচাই এবং পরিশোধিত বিলের হিসাব সঠিকভাবে হালনাগাদ করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।