মেহেরপুর সদর উপজেলার গহরপুরে কাজলা নদীর পাড় থেকে সরকারি মাটি অপসারণ করে বিভিন্ন ইটভাটায় নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে বলিয়ারপুর পুলিশ ক্যাম্পে কর্মরত কনস্টেবল রবিউলের মালিকানাধীন একটি এক্সকাভেটর (ভেকু)—এমন তথ্য জানিয়েছেন যন্ত্রটির চালক ও মাটি অপসারণের দায়িত্ব পাওয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম ফিরোজুর রহমান ফিরোজ। তবে নিলামের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মাটি অপসারণের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যও ভেকু ভাড়া দেওয়ার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) মেহেরপুর সদর উপজেলার গহরপুর এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, কাজলা নদীর পাড়ে স্তূপ করে রাখা মাটি এক্সকাভেটর দিয়ে কেটে ট্রাক্টরে বোঝাই করা হচ্ছে। পরে এসব মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় নেওয়া হচ্ছিল। এ সময় ঘটনাস্থলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কোনো প্রতিনিধিকে দেখা যায়নি।
কনস্টেবলের এক্সকাভেটর ব্যবহারের দাবি
ঘটনাস্থলে এক্সকাভেটর চালকের সঙ্গে কথা বলে যন্ত্রটির মালিক হিসেবে কনস্টেবল রবিউলের নাম জানা যায়। মাটি অপসারণের দায়িত্ব পাওয়া এস এম ফিরোজুর রহমান ফিরোজও তাঁর কাছ থেকে এক্সকাভেটর ভাড়া নেওয়ার কথা স্বীকার করেন।
ফিরোজুর রহমান বলেন, “আমার ভেকুটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় গতকাল রবিউল ভাইয়ের কাছ থেকে ভেকুটি ভাড়া করে এনেছি। আগে মুজিবনগর থানায় ছিল, তখন থেকে তাঁর সঙ্গে পরিচয়।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাটি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি দাবি করেন, রবিউল মুজিবনগর থানায় কর্মরত থাকার সময় থেকেই বিভিন্ন এলাকায় এক্সকাভেটর ভাড়া দেওয়ার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের দাবি, প্রায় চার বছর ধরে তিনি এ ব্যবসা করছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে কনস্টেবল রবিউলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আপনার মনে হয় কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে। আপনি একটু ভালো করে খোঁজখবর নেন।”
নিলামের মেয়াদ শেষ, নতুন অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কাজলা নদী পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় নদীর ১৩ দশমিক ৪০০ থেকে ১৩ দশমিক ৬০০ কিলোমিটার অংশ থেকে উত্তোলিত মাটি বিক্রির জন্য গত ১৫ জুন নির্দেশনা দেওয়া হয়। ‘লট নং-নিলাম-০৬/২০২৫-২৬’-এর আওতায় ৬ হাজার ৭৮৯ দশমিক ৭৫ ঘনমিটার মাটি অপসারণের জন্য সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে এস এম ফিরোজুর রহমানকে নির্বাচিত করা হয়। এ জন্য তিনি ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা দর দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই নিলামের মেয়াদ গত ৩০ জুলাই শেষ হয়েছে। এরপর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে কি না, কিংবা নতুন করে মাটি অপসারণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফিরোজুর রহমানের দাবি, তিনি মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছেন এবং আগামী রোববার বা সোমবারের মধ্যে অনুমোদনের কাগজ হাতে পাবেন। বৃষ্টি ও নানা জটিলতার কারণে আগে কাজ শুরু করতে পারেননি বলেও জানান তিনি।
পরে তিনি এক গণমাধ্যমকর্মীকে হোয়াটসঅ্যাপে আগের নিলামসংক্রান্ত কিছু কাগজ পাঠান। আরেক গণমাধ্যমকর্মীর কাছেও তিনি নথি পাঠান। সঙ্গে পাঠানো একটি ভয়েস বার্তায় বলেন, “ভাইয়া, আমার কাছে এই কাগজগুলো আছে। যদি এই কাগজ নিয়ে নিউজ কর, তাহলে আমাকে নিউজের লিংকটা দিও।”
তবে সরবরাহ করা কাগজগুলো নতুন অনুমোদন অথবা নিলামের মেয়াদ বৃদ্ধির বৈধতা নিশ্চিত করে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অনুমোদন ও তদারকি নিয়ে পাউবোর বক্তব্য
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নিলামের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মাটি অপসারণ করতে উপজেলা ও জেলা কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “জেলা কমিটি অনুমোদন দিলে তবেই তারা মাটি নিতে পারবে। তবে সেটা তারা পেয়েছে কি না, এখন পর্যন্ত আমি জানি না। আমি যতটুকু জানি, কাজটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।”
নিলামের শর্ত অনুযায়ী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে মাটি অপসারণ করার কথা। একই সঙ্গে সরানো মাটির পরিমাণ পরিমাপ করে রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে মাটি অপসারণের সময় পাউবোর কোনো প্রতিনিধির উপস্থিতি দেখা যায়নি। ফলে অনুমোদনের বর্তমান অবস্থা, অপসারিত মাটির প্রকৃত পরিমাণ এবং নিলামের শর্ত যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির লিখিত সিদ্ধান্ত, অনুমোদনের নথি এবং মাটি অপসারণের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত যন্ত্র ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি প্রযোজ্য বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও নথির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
