স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের মসৃণ, টেকসই ও স্থিতিশীল উত্তরণ নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং গ্রুপ অব ৭৭ অ্যান্ড চায়না (জি-৭৭) তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অনুরোধ অনুযায়ী এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে।

জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির-এর সঙ্গে পৃথক বৈঠকে ইইউর প্রতিনিধিদলের প্রধান রাষ্ট্রদূত স্টাভরোস ল্যামব্রিনিডিস এবং জি-৭৭ ও চায়নার চেয়ার ও জাতিসংঘে উরুগুয়ের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত লরা দুপুই লাসেরে বাংলাদেশের প্রতি এ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী, ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর এবং বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান উপস্থিত ছিলেন।

প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর পক্ষে বাংলাদেশের যুক্তি

বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি খাতের চাপ, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর এবং চলমান কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ অতিরিক্ত তিন বছরের প্রস্তুতিকাল চেয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আর্থিক খাতের সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অতিরিক্ত সময় পেলে এসব সংস্কার আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, যা এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।

ইইউ: এফটিএ আলোচনাকে স্বাগত

ইইউর প্রতিনিধিদলের প্রধান রাষ্ট্রদূত স্টাভরোস ল্যামব্রিনিডিস বাংলাদেশের সুশাসন ও টেকসই উন্নয়নের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়াকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের পুরো প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

জি-৭৭-এর সমর্থন ও বিশেষ ব্রিফিংয়ের প্রস্তাব

জি-৭৭ ও চায়নার চেয়ার রাষ্ট্রদূত লরা দুপুই লাসেরে বাংলাদেশের উপস্থাপিত যুক্তিকে “শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য” বলে অভিহিত করেন। তিনি বাংলাদেশের চলমান সংস্কার কর্মসূচির প্রশংসা করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ কৌশল নিয়ে একটি বিশেষ ব্রিফিং আয়োজনের প্রস্তাব দেন।

বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানায় এবং এটিকে আন্তর্জাতিক সমর্থন আরও সুসংহত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে।

ফলপ্রসূ বৈঠকের মূল্যায়ন

বৈঠক শেষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বলেন, ইইউর সঙ্গে আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ যাতে মসৃণ, টেকসই এবং স্থিতিশীল হয়, সে লক্ষ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ধারাবাহিক সমর্থনের আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেছে।

প্রেক্ষাপট

জাতিসংঘের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। তবে উত্তরণের পর শুল্কসুবিধা, রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোতে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে দেশকে। এ কারণে সরকার প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে আসছে, যাতে অর্থনৈতিক সংস্কার, শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রূপান্তর নিশ্চিত করা যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইইউ ও জি-৭৭-এর প্রকাশ্য সমর্থন বাংলাদেশের এলডিসি-পরবর্তী রূপান্তরকে আরও শক্তিশালী কূটনৈতিক ভিত্তি দিতে পারে এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।