প্রসববেদনায় কাতর এক গর্ভবতী নারী, সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত একজন যুবক কিংবা জরুরি অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকা হার্নিয়ার রোগী—এসব পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয় হওয়ার কথা সরকারি হাসপাতাল। কিন্তু মেহেরপুরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে গত প্রায় দেড় মাস ধরে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় চিকিৎসক, হাসপাতাল সূত্র ও রোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শূন্যপদের কারণে সিজারিয়ানসহ অধিকাংশ বড় অপারেশন বন্ধ থাকায় রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক অথবা জেলার বাইরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট জেলা মেহেরপুরের প্রায় সাত লাখ মানুষের জন্য এই হাসপাতালই সরকারি বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র। জেলার অপর দুটি সরকারি হাসপাতাল—গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও দীর্ঘদিন ধরে অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞের পদ শূন্য রয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। ফলে জেলা পর্যায়ের অস্ত্রোপচার সেবার ওপর চাপ প্রায় পুরোপুরি মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের ওপরই নির্ভরশীল ছিল।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, হাসপাতালের একমাত্র অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মেহেদী হাসান গত মে মাসে বদলি হওয়ার পর থেকেই সিজারিয়ান, হার্নিয়া, অ্যাপেন্ডিসাইটিস এবং দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের জরুরি অস্ত্রোপচারসহ বড় অপারেশন বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে কেবল স্থানীয় অবশ (লোকাল অ্যানেসথেসিয়া) ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে ছোটখাটো অস্ত্রোপচার ও ড্রেসিং করা হচ্ছে।

হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০টি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হতো। তবে গত দেড় মাসে এই কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বহু রোগী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্রের দাবি। এই সংখ্যা ও সময়কাল স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মেহেরপুর শহরের বাসিন্দা হাসান মণ্ডল জানান, হার্নিয়ার অপারেশনের জন্য তিনি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় অস্ত্রোপচার সম্ভব হয়নি। পরে তিনি একটি বেসরকারি ক্লিনিকে অপারেশনের জন্য প্রায় ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই ব্যয়ের পরিমাণও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

হাসপাতালের ওটি ইনচার্জ মিলন শর্মা বলেন, অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় বড় ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। নতুন চিকিৎসক যোগ দিলে অপারেশন কার্যক্রম পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।

একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি) ডা. ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, জরুরি অস্ত্রোপচারের রোগীদের অনেককেই অন্য জেলায় রেফার করতে হচ্ছে অথবা তারা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

এদিকে সরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন রোগীর স্বজন। তারা অভিযোগ করেন, অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যআয়ের পরিবারগুলো বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়ছে। তবে স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই—এমন দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (সুপার) ডা. সাজ্জাদ হোসেনের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে হাসপাতালে গিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা ও নার্স, যারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন, দাবি করেন, হাসপাতালের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক ও পেশাগত কিছু মতবিরোধ রয়েছে। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং স্বাধীনভাবে তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মেহেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম আবু সাঈদ বলেন, গাংনী ও মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শূন্যপদ পূরণের জন্য বিভাগীয় কার্যালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

তবে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের বিষয়ে তিনি বলেন, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বিষয়টি অধিকতর ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। ওই হাসপাতালে অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞের পদ পূরণের জন্য মন্ত্রণালয় বা বিভাগীয় কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তার কাছে কোনো অনুলিপি নেই।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে প্রকাশিত সরকারি তথ্যও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকটের বিষয়টি সামনে আনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা পর্যায়ে অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘ সময় খালি থাকলে জরুরি অস্ত্রোপচার, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা এবং দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের চিকিৎসা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের সংকটের টেকসই সমাধানে শুধু শূন্যপদ পূরণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জেলা হাসপাতালভিত্তিক জনবল পরিকল্পনা, দ্রুত বদলি-পরবর্তী পদায়ন, নিয়মিত মনিটরিং এবং জরুরি চিকিৎসা সেবার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। অন্যথায় সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র জনগোষ্ঠী ক্রমেই ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসার দিকে ঠেলে দেওয়া হবে।